জাতীয় সংবাদ

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণে আপত্তি ভারতীয়দের : গ্রামবাসীর বিক্ষোভ

৫ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার শুভেন্দু’র
পুশ-ইন ঠেকাতে ভারতকে দফায় দফায় চিঠি বাংলাদেশের

প্রবাহ ডেস্ক : বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে ঘিরে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি সীমান্তবর্তী গ্রামে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমানে যে স্থানে বেড়া নির্মাণের কাজ চলছে, তা শেষ হলে পুরো গ্রামই কার্যত নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে চলে যাবে এবং দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এ কারণে কাজ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন গ্রামবাসীরা।
সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, মেঘালয় রাজ্যের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দারা রোববার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। তাদের দাবি, সীমান্তের শূন্যরেখা (জিরো লাইন) বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হবে, অন্যথায় তারা দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। মেঘালয়ের পূর্ব খাসি হিলস জেলার লিংখং গ্রামটি প্রায় শূন্যরেখার ওপরই অবস্থিত। এই গ্রামের বাড়িঘর বাংলাদেশের একটি বসতি থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরেই অবস্থিত। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে অন্তত ১৫০ গজ দূরে বেড়া নির্মাণ করতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোভিড-১৯ মহামারির সময় গ্রামবাসীরা বাঁশের একটি বেড়া নির্মাণ করে বাংলাদেশ ও গ্রামের মধ্যে আলাদা সীমারেখা তৈরি করেছিলেন। এরপর থেকে পরিস্থিতিতে তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিরুদ্ধে রবিবার গ্রামবাসীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন এবং পাইনুরসলার উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে চলমান বেড়া নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান। গ্রামপ্রধান রামু বার্তাসংস্থা পিটিআইকে বলেন, ‘আমরা সীমান্তে বেড়া নির্মাণের বিরোধী নই। তবে আমরা চাই, বেড়াটি শূন্যরেখা বরাবর নির্মাণ করা হোক, যাতে আমাদের গ্রাম ভারতের ভেতরে এবং বেড়ার সুরক্ষা বেষ্টনীর মধ্যেই থাকে।’
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী বেড়া নির্মাণ করা হলে লিংখং গ্রামটি নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে থেকে যাবে। এতে যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা রিমা খংসদির বলেন, ‘বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বেড়া নির্মাণ করা হলে আমাদের গ্রাম বেষ্টনীর বাইরে পড়ে যাবে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। রাজ্য সরকার যেন আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং ভারত সরকারের কাছে তুলে ধরে, সেটাই আমরা চাই।’
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে মেঘালয়ের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪৪৪ কিলোমিটার। স্থানীয় নানা সমস্যা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে এই ৪৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৮০ কিলোমিটারেরও কম অংশে এখনও বেড়া নির্মাণ করা হয়নি।
সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে লিংখং গ্রামে ইতোমধ্যে একটি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গ্রামটিতে বিএসএফের উপস্থিতি রয়েছে এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যেসব এলাকায় মানুষের বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থানে শূন্যরেখা বরাবর এক সারির বেড়া নির্মাণের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে ভারত।
তিনি বলেন, ‘শূন্যরেখা বরাবর এক সারির বেড়া নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশের নতুন সরকার এখনও এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।’
৫ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার শুভেন্দু’র : পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত এক মাসে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার কোলকাতায় এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় না পড়া বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর কাজ আমরা শুরু করেছি।’ তার ভাষ্য, গত মে-তে রাজ্যের সব জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, ‘এসব কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’
তার দাবি, বর্তমানে আরও ৮৩৬ জন এসব হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন এবং তাদেরও শিগগির ফেরত পাঠানো হবে।
এএফপি জানায়, ১০ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই সীমান্তবর্তী রাজ্যের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনী প্রচারে দলটি অবৈধ অভিবাসীদের ‘শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং ফেরত পাঠানোর’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ ও তুলনামূলক অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্দশা ও দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের মধ্যে অভিবাসন হয়ে আসছে।
ক্ষমতায় এসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি নাগরিক এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আটককেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেয়।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা অতীতে অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
সমালোচকদের অভিযোগ, বিজেপির বক্তব্য ও নীতিমালা ভারতের ২০ কোটির বেশি মুসলমানের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রান্তিকতার অনুভূতি বাড়িয়েছে।
তাদের মতে, দলটি ধর্মীয় পরিচয়কে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে একাকার করে দেখছে।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারত শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনা পরে ভারতে আশ্রয় নেন।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের সোমবার নয়াদিল্লিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পুশ-ইন ঠেকাতে ভারতকে দফায় দফায় চিঠি ঃ পুশ-ইন ঠেকাতে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) শক্তভাবে প্রতিহত করছে বলে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন পুশ-ইন বন্ধে ভারত সরকারকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সোমবার (৮ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ কথা বলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের পুশ-ইনের চেষ্টা বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে। নিয়ম না মেনে পুশ-ইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। পুশ-ইন বন্ধে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে ভারতকে। তিনি বলেন, ইলিগ্যাল (অবৈধ) যারা আছে তাদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে। পুশ-ইন দুই দেশের দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্কে পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) শিশু, নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো ঠেকাতে সম্প্রতি বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে বিপুল সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা তারা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাদের সহযোগিতা করছেন। ভারত থেকে পুশ-ইনের মধ্যে আজ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button