মোংলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড স্টেশনে গ্রামবাসীর হামলার ঘটনায় ৩ শতাধিকের বিরুদ্ধে মামলা : আটক ৬

বাগেরহাট প্রতিনিধি ঃ সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে উপকুলীয় জেলা বাগেরহাটের মোংলায় স্থাপিত কোস্ট গার্ডের একটি ভাসমান স্টেশনে অতর্কিত হামলা ও সরকারি সম্পত্তি ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৩ শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে শুক্রবার মোংলা থানায় মামলা দায়ের করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মোংলার চিলা ইউনিয়নের সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনিরঘোল এলাকার কোস্ট গার্ডের ভাসমান স্টেশনে (হাড়বাড়িয়া) হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বৃহস্পতিবার রাতভর ওই এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ চিরুনি অভিযান চালিয়ে জয়মনি এলাকার চিলা ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সুলতান শেখ ও ৩ জন নারীসহ মোট ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলের দিকে আটককৃতদের বাগেরহাট আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরন করা হয়েছে। বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের পরিকল্পনায় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন শুক্রবার বিকেলে এ তথ্য জানান। এ দিকে পুলিশ ও কোস্ট গার্ড সুত্রে জানা যায়, মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বনদস্যু, চোরাকারবারি, বিষ দিয়ে মাছ শিকারী ও অবৈধ ভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বন্যপ্রানী হত্যা ও পাচারকারীদের একটি প্রধান কৌশলগত ঘাঁটি বা রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ওই অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের ভাসমান স্টেশনটি স্থাপন করার পর থেকে অপরাধীদের লজিস্টিক সাপোর্ট, অস্ত্র সরবরাহ এবং চোরাচালানের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্থ হওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও দুষ্কৃতকারী সিন্ডিকেট বেশ কিছুদিন ধরে স্টেশনটি উচ্ছেদের পাঁয়তারা ও অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রায় দুই থেকে তিন শতাধিক লোক সংঙ্গবদ্ধ হয়ে হঠাৎ তারা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জয়মনির শ্যালার খালে অবস্থিত স্টেশনে অতর্কিত হামলা ও সরকারি সম্পত্তি ভাংচুর চালায়। কোস্ট গার্ড সদস্যরা স্টেশনের অস্ত্র, গুলি ও সরকারি সম্পদ রক্ষার্থে আত্মরক্ষা জোরদার করলে সংঘর্ষে কোস্ট গার্ডের ৩ জন সদস্য গুরুতর আহত হন। মূলত বনদস্যু দমন ও কোস্ট গার্ডের চলমান সফল অভিযানকে নস্যাৎ করতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষের। অপরদিকে স্থানীয় প্রতিপক্ষের দাবি, কোষ্টগার্ডের মাধ্যমে নিখোঁজ মিরাজ শেখ নামের এক যুবকের সন্ধান চাইতে গিয়ে এ সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, গত কিছুদিন ধরে জয়মনি এলাকার ‘মিরাজ শেখ’ নামের এক স্থানীয় যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। মিরাজের স্বজনদের দাবি, তার এই আকস্মিক নিখোঁজ হওয়ার পেছনে যে কোন একটি বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে মিরাজের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় যুবকেরা কোস্ট গার্ড স্টেশনে গিয়ে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান এবং খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় সেখানে কোস্ট গার্ড সদস্যদের সাথে কথা কাটাকাটি ও বাগবিতান্ডার একপর্যায়ে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে তাদের ওপর প্রথমে লাঠিচার্জ করা হয়। এতে উত্তেজিত হয়ে সাধারণ গ্রামবাসী ও নিখোঁজ যুবকের স্বজনেরা কোস্ট গার্ডের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং কোস্ট গার্ড ষ্টেশনে হামলা ও ভাংচুর চালায়। এ ঘটনায় কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান শাহিন বাদি হয়ে জয়মনি এলাকার ৪৪ জনকে চিহ্নিত করে করে অজ্ঞাত আরো প্রায় ৩শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে মোংলা থানায় মামলা করে কোস্ট গার্ড। আটককৃতরা হচ্ছে, মুক্তা বেগম, লিজা ইসলাম, তাসলিমা বেগম, সুলতান শেখ, মহারাজ খান ও মোঃ শাহজালাল ফরাজী। তাদের সকলের বাড়ি মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনি এলাকায়। শনিবার সকালে ওই এলাকায় খোজ নিয়ে জানা গেছে গ্রেফতার এড়াতে এলাকা এখন পুরুষশূন্য থমথমে পরিস্থিতি বিরাজমান। মামলা দায়েরের পর থেকে পুরো জয়মনি এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মামলার এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের গ্রেফতার করতে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান ও কঠোর নিরাপত্তা টহল জোরদার রাখা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়। মোংলা থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, গ্রেফতারকৃত আসামীদের আদালতের মাধ্যমে জেলা হাজতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অপরাধীদের শনাক্ত করতে কোস্ট গার্ডের দেওয়া ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় আসামিদের গ্রেফতারে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে।



