‘ইয়ামালের জাদু ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়’

# স্পেন ৪, সৌদি আরব ০ #
প্রবাহ স্পোর্টস ডেস্ক ঃ খেলা শুরুর আগে থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন লামিনে ইয়ামাল। খেলা শেষ হওয়ার অনেক পরেও তিনিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। কেপ ভার্দের সঙ্গে স্পেনের অপ্রত্যাশিত গোলশূন্য ড্র ম্যাচে মাত্র ১৯ মিনিট খেলার সুযোগ পাওয়া এই ১৮ বছর বয়সী তরুণ তার প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ শুরু করার আশায় আটলান্টায় ফিরেছিলেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তে জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ ছিল। কারণ, ইয়ামাল এপ্রিলে পাওয়া হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে সেরে ওঠার বিষয়টি তার মাথায় ছিল। সৌদি আরবের বিপক্ষের ম্যাচে স্টেডিয়ামের পরিবেশে তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। হাজার হাজার ভক্ত ইয়ামালের নাম লেখা জার্সি পরেছিল। যতবারই বড় পর্দায় তার মুখ ভেসে উঠেছে, ততবারই গর্জন করে উঠেছে স্টেডিয়ামের গ্যালারি। স্পেনের এই তরুণ তারকা তিনি ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্রটাই পাল্টে দিলেন। স্পেন আরও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সাহস, গতি এবং নির্ভীকতার সঙ্গে খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই লামিন ইয়ামাল। তার প্রাক্তন স্প্যানিশ সতীর্থ সিজার আজপিলিকুয়েতা ইয়ামাল সম্পর্কে ‘ম্যাচ অফ দ্য ডে’-কে বলেন, ‘আপনি কিছু পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু যখন আপনি তার মতো একজন খেলোয়াড়কে আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনতা নিয়ে খেলতে দেখেন, তখন সে এমন অনেক কিছু তৈরি করতে পারে যা আমি শেখাতে পারতাম না। ইয়ামাল জানেন মাঠে থাকলে কীভাবে সুযোগ তৈরি করতে হয়, ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করতে হয় এবং কোথায় বল পেতে হয়। সেখান থেকে প্রতিটি ম্যাচেই উন্নতি করছে সে।’ ক্ষুরধার, নির্ভীক এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর লামিন ইয়ামাল অনায়াসে ডিফেন্ডারদের পাশ কাটিয়ে স্পেনের আক্রমণে প্রাণ সঞ্চার করেন। গোলপোস্টের সামনে দিয়ে একটি নিচু ক্রস দ্রুতগতিতে চলে গেল এবং লামিন ইয়ামাল ব্যাক পোস্টে পৌঁছে স্লাইড করে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলটি করেন, যা ছিল তার বিশ্বকাপের প্রথম গোল। আটলান্টার স্টেডিয়াম তখন উল্লাসে ফেটে পড়ল, ভক্তরা নাচতে নাচতে ইয়ামালের নাম ধরে স্লোগান দিতে লাগল। ফাইভ লাইভে কথা বলতে গিয়ে গিলেম বালাগে বলেন, তিনি লামিন ইয়ামালকে এমনভাবে মাঠে নামতে দেখেছেন যেন তিনি এইমাত্র বিশ্ব জয় করেছেন। তিনি বলেন, “এটা কি অহংকার? নাকি আত্মবিশ্বাস? দুটোরই মিশ্রণ। দলের নেতা হিসেবে সে যে ভূমিকা পালন করছে তাতে সে খুবই খুশি। সে আমাকে একবার বলেছিল যে, ফুটবল খেলার সময় তার আনন্দ হয়।’ লামিনে ইয়ামাল ইতিহাসে সপ্তম খেলোয়াড় হিসেবে ১৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিশ্বকাপে গোল করেছেন এবং ১৮ বছর বা তার কম বয়সী হিসেবে ম্যাচের প্রথম গোলদাতা হওয়া দ্বিতীয় খেলোয়াড়। এর আগে ১৯৫৮ সালে ওয়েলসের বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে ১৭ বছর বয়সী পেলে এই কীর্তি গড়েছিলেন। ওয়েন রুনি এই কিশোরের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, লিওনেল মেসির সঙ্গে তার তুলনা হওয়াটা ছিল অনিবার্য। ইয়ামাল বার্সেলোনায় মেসির অনেক রেকর্ড ভেঙেছেন এবং এখন তিনি বিশ্বমঞ্চেও তাকে ছাড়িয়ে গেছেন। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে প্রথম গোল করার সময় আর্জেন্টাইন তারকা মেসির বয়স ছিল ১৯ বছর, আর স্প্যানিশ তারকা তার চেয়ে দুই সপ্তাহ কম বয়সে এই কীর্তি গড়েছেন। ইংল্যান্ডের সাবেক এই ফরোয়ার্ড ‘ম্যাচ অফ দ্য ডে’-কে বলেন, ‘মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রে, তাদের প্রচেষ্টা এবং নিষ্ঠাই হলো এই বিশ্বকাপে তাদের খেলার কারণ। তারা সবকিছু ঠিকঠাক করেছে। আশা করি ইয়ামালও তা করতে পারবে।’ যা সত্যিই চিত্তাকর্ষক তা হলো, যখন মেসি বার্সেলোনা দলে এসেছিলেন, তখন সেখানে কিছু শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড় ছিলেন এবং রোনালদিনহোর সঙ্গে তার একটি মেলবন্ধন ছিল। কিন্তু ইয়ামাল এমন একটি বার্সেলোনা এবং স্পেন দলে এসেছেন এবং যে দলে তিনিই প্রধান খেলোয়াড়। জয়ের জন্য সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইউরো জয়ে তার একটি বড় ভূমিকা ছিল এবং এই বিশ্বকাপেও তার একটি বড় ভূমিকা থাকবে। এটাই সত্যিই মুগ্ধ করে যে, এত অল্প বয়সে সে এই চাপ নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। আশা করা যায়, সে আগামী ১৫-২০ বছর সে এটা ধরে করতে পারবে। রুনি আরও বলেন, ‘ইয়ামালের জাদু ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় এবং এরপর আরও গোল আসতে থাকে। আশা করা যায়, তাকে এ্যাসিস্ট করার জন্য তার চারপাশে সঠিক দল থাকবে। আশা করি, সে যা করছে তা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি সে পাবে।’ মিকেল ওয়ায়ারজাবাল দ্রুত পরপর দুটি গোল করে এক অসাধারণ সূচনা পর্বের সমাপ্তি ঘটান। দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্টের সুবাদে, তিনি ১৯৬৬ সালের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিটের মধ্যে তিনটি গোলে সরাসরি জড়িত থাকার কৃতিত্ব অর্জন করেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে তার আগের ম্যাচের পারফরম্যান্সের সঙ্গে এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে তিনি প্রথম ৩০ মিনিট একটিও টাচ করতে পারেননি। সৌদির বিপক্ষের ম্যাচটি ছিল ভিন্ন। এই ম্যাচে স্পেনের আধিপত্য স্কোরবোর্ডে প্রতিফলিত হচ্ছিল এবং তাদেরকে পুরোপুরি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নের মতোই দেখাচ্ছিল। ইয়ামালের কাজ হাফ-টাইমের মধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। উরুগুয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচ বাকি থাকায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে তুলে নেওয়া হয়। ‘ম্যাচ অফ দ্য ডে’-তে কথা বলতে গিয়ে টমাস ফ্রাঙ্ক বলেন: ‘ইয়ামাল সবসময় বল চায়। সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তার যে দৃঢ়সংকল্প ও একাগ্রতা, তার সঙ্গে এটাও প্রশ্ন থাকে যে, যখন সে জানে সবাই তাকে নতুন উদীয়মান সুপারস্টার বলছে, তখন সে কীভাবে যথেষ্ট বিনয়ী থাকতে পারে।’ স্পেন তার ফিটনেসের বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে সামলে চলছে। কারণ সম্পূর্ণ ফিট লামিনে ইয়ামাল নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন।



