জাতীয় সংবাদ

২০২৫ সালে সেবা খাতে দুর্নীতি বেড়েছে

ঘুষ ১২৬৩৩ কোটি টাকা: টিআইবি

প্রবাহ রিপোর্ট : গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বৈষম্যহীন, সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্ত ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ১৮টি খাত ও সেবার ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে জাতীয়ভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। আগের জরিপের মতো এবারও পাসপোর্ট ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হয়েছেন।
তবে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এরপরও বিচার-সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং ও ভূমি খাতে গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার-সংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেও দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা বেড়েছে বা আগের মতোই রয়ে গেছে।
জরিপে গ্রাম ও শহরের মধ্যে দুর্নীতির অভিজ্ঞতায়ও পার্থক্য উঠে এসেছে। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরে এ হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ঘুষের পরিমাণের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের মানুষকে তুলনামূলক বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। শহরে গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ টাকা এবং গ্রামে ৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
নি¤œ আয়ের পরিবারগুলো উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় তাদের বার্ষিক আয়ের বড় অংশ ঘুষ হিসেবে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং প্রান্তিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা এবং শিক্ষা খাতে নারী সেবাগ্রহীতাদের উল্লেখযোগ্য হারে দুর্নীতির শিকার হওয়ার বিষয়টি এসব খাতে নারীদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করছে বলেও মন্তব্য করেছে টিআইবি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের দালাল-নির্ভরতা ও ঘুষ প্রদানের ঝুঁকি বহাল রয়েছে। ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল পদ্ধতির মিশ্র ব্যবস্থার কারণে সেবা পেতে অতিরিক্ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
দুর্নীতির কারণ হিসেবে অধিকাংশ উত্তরদাতা বিচারহীনতা, জনসচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন। ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ খানা জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না’। টিআইবির মতে, এটি ঘুষ আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেরই প্রমাণ।
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক খানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। দুদক সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ খানা অবগত থাকলেও অভিযোগ দায়েরের হার অত্যন্ত কম।
অভিযোগ করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাওয়া যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এক-পঞ্চমাংশের বেশি ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণই করা হয়নি এবং ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
দুর্নীতির শিকার হওয়া ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ খানা মনে করে, ‘সেবা নেওয়ার ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত, তাই অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই।’
টিআইবির মতে, এই ধারণা দেশে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং তা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button