নিরাপত্তাহীনতায় ঘরে বন্দি শিশুর শৈশব

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ একটা সময় কাঁধ থেকে স্কুলের ব্যাগ নামিয়ে শিশুরা ছুটতো পাড়ার মাঠগুলোতে, তাদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। দড়িলাফ, গোল্লাছুট, সাইকেল চালানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ-এসবই ছিল শৈশবের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলে গেছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে। শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও সহিংসতার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক পরিবার এখন মেয়েদের একা বাইরে পাঠাতে ভয় পায়। ফলে খেলার মাঠ, পার্ক কিংবা পাড়ার সামাজিক পরিসর থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মেয়েশিশুরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব হলেও এর প্রভাবে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ব্যাহত হচ্ছে। শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ-খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা এবং স্বাধীনভাবে পৃথিবীকে আবিষ্কার করার সুযোগ-ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার চিত্রও একই কথা বলে। বিকেলে মাঠে ছেলেশিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়লেও মেয়েশিশুদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। যারা আসে, তাদের বেশিরভাগই পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে আসে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যায়। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাসরিন আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, মেয়েকে একা মাঠে খেলতে পাঠাতে ভয় লাগে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু নির্যাতনের খবর দেখি। তাই স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও ওকে একা যেতে দিই না। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মিরপুরের বাসিন্দা রুবিনা বেগম। তার ভাষায়, আমাদের ছোটবেলায় বিকেলভর বাইরে খেলেছি। এখন মেয়েকে বারান্দার বাইরে রাখতেও ভয় লাগে। নিরাপত্তার চিন্তা সবসময় মাথায় থাকে। এই উদ্বেগের কারণে অনেক শিশুর দৈনন্দিন জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বাসা, স্কুল ও কোচিং সেন্টারের মধ্যে। অবসর সময়ের বড় একটি অংশ কাটছে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা টেলিভিশনের সামনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, খেলাধুলা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মাঠে খেলার সময় শিশুরা দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া, দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করা এবং নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। তিনি বলেন, বাচ্চারা খেলাধুলা করতে না পারলে তাদের নানা ধরনের আবেগের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে তাদের শারীরিক বিকাশও ঠিকভাবে হয় না। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সক্ষমতা দিন দিন কমে যায়। এমনকি তারা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া থেকেও ছিটকে পড়তে শুরু করে। তিনি আরও বলেন, যখন একটি শিশু নিয়মিত বাইরে গিয়ে খেলতে পারে না, তখন তার সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, অতিরিক্ত সুরক্ষার কারণে অনেক শিশুর মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ফলে তারা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে বা নিজের মতামত প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। শুধু মানসিক নয়, শারীরিক দিক থেকেও এর প্রভাব রয়েছে। বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্ক্রিন-নির্ভরতার সমস্যা বাড়ছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাইরে খেলার সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক শিশু প্রয়োজনীয় শারীরিক অনুশীলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবার এখনও মনে করে, মেয়েদের বেশি বাইরে থাকা বা খেলাধুলা করা উচিত নয়। ফলে নিরাপত্তা-উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক বিধিনিষেধও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা লুৎফা বলেন, ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়, মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই দেওয়া হয় না। নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর আড়ালেও অনেক সময় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কাজ করে। তিনি আরও বলেন, একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার পরিবর্তে যদি মেয়েদের চলাফেরা সীমিত করে সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজকেই বহন করতে হবে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবার বা অভিভাবকদের একার নয়। রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। খেলার মাঠ, পার্ক ও জনপরিসরকে শিশুবান্ধব এবং নিরাপদ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। তিনি বলেন, শিশুদের শুধু ভয় দেখিয়ে বা ঘরের ভেতর আটকে রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা, আত্মরক্ষার প্রাথমিক ধারণা এবং বিপদের সময় কী করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। রাজধানীর ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ১২ বছর বয়সী মেহজাবিন (ছদ্মনাম) জানায়, আগে সে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে যেত। এখন সপ্তাহে একদিনও যাওয়া হয় না। মা ভয় পায়। বলে, একা বাইরে যাওয়া যাবে না। তাই বাসায় বসে ফোন দেখি বা বই পড়ি, বলে সে। তার কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান সময়ের অনেক মেয়েশিশুর বাস্তবতা। তাদের শৈশবের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে ঘরের দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তাদের স্বাধীন ও সুস্থ শৈশবের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে যদি মেয়েশিশুরা মাঠ, পার্ক এবং সামাজিক পরিসর থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু তাদের ব্যক্তিগত বিকাশই নয়, সমাজও হারাবে আত্মবিশ্বাসী, সক্রিয় ও সক্ষম একটি প্রজন্মকে। একসময় যে মাঠগুলো শিশুদের হাসিতে মুখর থাকত, সেগুলো আজ অনেক জায়গায় নীরব। সেই নীরবতা শুধু খেলার শব্দের অনুপস্থিতি নয়; এটি এমন এক শৈশবের গল্প, যা ভয়, উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতার চাপে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে মেয়েশিশুরা আবারও নির্ভয়ে মাঠে দৌড়াতে পারবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারবে এবং শৈশবকে শৈশবের মতো করেই উপভোগ করতে পারবে? সবারই প্রত্যাশা, কন্যাশিশুদের জন্যও নিশ্চিত হোক নিরাপদ পরিবেশ। ভয় নয়, মুক্ত বাতাসে হাসি-খেলায় ভরে উঠুক তাদের শৈশব।


