মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের রূপবদল : পাল্টে যাচ্ছে সমীকরণ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জর্দানের একটি বিমান ঘাঁটিতে হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান দাবি করে আসছে যে, তাদের কাছে এমন কিছু গোপন সামরিক সক্ষমতা রয়েছে যা শত্রুদের চমকে দিতে পারে। ইরানি কমান্ডাররা বারবার দাবি করেছেন যে, তারা এখনো তাদের কৌশলগত অস্ত্রের পূর্ণ শক্তি প্রদর্শন করেননি। অতীতে এই দাবি গুলোকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও, সাম্প্রতিক উপর্যুপরি হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের সেই হুঁশিয়ারি এখন আর কেবল কথার কথা নয়। জর্দানের ‘মুওয়াফাক সালতি’ বিমান ঘাঁটিতে এই হামলাটি এমন এক সময়ে চালানো হলো, যার ঠিক আগেই ইরান সতর্ক করেছিল যেÑপরবর্তী যেকোনো হামলা আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া চারজন আহত সেনাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে জর্দানে মার্কিন বাহিনীর ওপর এটি ছিল চতুর্থ ইরানি হামলা। এর আগের হামলাগুলোতে ডজনখানেক সেনা আহত হয়েছিল এবং হেলিকপ্টারসহ বেশ কয়েকটি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জর্দানের ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের এই ঘনীভূত ও তীব্র আক্রমণকে বিশেষজ্ঞরা একটি সম্ভাব্য “শেপিং অপারেশন” বা প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক অভিযান হিসেবে দেখছেন; যার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি বড় ধরনের মূল আক্রমণের আগে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। ওয়াশিংটনই তেহরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলেও, ইরানের এই অভিযানের আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে সেই প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কটিকে ধ্বংস করা, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে যাওয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে পথেই ভূপাতিত করতে পারত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জর্দান সরাসরি ইসরায়েল অভিমুখী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রধান করিডোরের ওপর অবস্থিত। গত দুই বছরে জর্দান তাদের আকাশসীমা অতিক্রমকারী বিপুল সংখ্যক প্রজেক্টাইল ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। ইরানের হামলার শিকার হওয়া প্রতিরক্ষা অঞ্চলগুলোর দুটি ইসরায়েলের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা কিংবা ইসরায়েল অভিমুখী হামলা ঠেকানোর সক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দিতে জর্দানের এই ঘাঁটিগুলো ইরানের স্বাভাবিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ড ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র নগরী ঃ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এ উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন এমন সব অস্ত্র ব্যবহার করছে যা চরম গতিবেগে ছুটতে পারে এবং বায়ুম-লে অবতরণের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে এগুলোকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, তেহরান মাটির নিচের গোপন “মিসাইল সিটি” বা ক্ষেপণাস্ত্র নগরীগুলোর মাধ্যমে তাদের যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে ইরান খুব দ্রুত তাদের অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে এবং মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী ও অবিরাম হামলা চালানোর ক্ষমতা ধরে রাখছে। কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন যে, ইরান এই নিখুঁত হামলার জন্য চীন বা রাশিয়ার মতো বিদেশি শক্তির কাছ থেকে প্রযুক্তিগত বা গোয়েন্দা সহায়তা পাচ্ছে। এই লড়াইয়ে তেহরান হয়তো ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে, কারণ এগুলো তৈরি করা সস্তা এবং একসাথে ঝাঁকে ঝাঁকে উৎক্ষেপণ করা যায়। ইসরায়েলের ওপর একটি ব্যাপক ড্রোন হামলা ইরানের “শেপিং অপারেশন” তত্ত্বটিকে আরও জোরালো করবে; যা জর্দান ও আমেরিকার যৌথ প্রতিরক্ষা ক্ষমতাকে এতটাই দুর্বল করে দিতে পারে যে, পরবর্তীতে জর্দানের আকাশসীমা ব্যবহার করে ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি ড্রোন অনায়াসে ইসরায়েলে পৌঁছে যাবে। জর্দান ও আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঃ জর্দানের ‘মুওয়াফাক সালতি’ এবং ‘প্রিন্স হাসান’Ñএই দুটি বিমান ঘাঁটিতেই প্রচুর পরিমাণে মার্কিন যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং এগুলো ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি ও হামলার ধরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে, তারা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছে যা ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুল নিশানা নিশ্চিত করে এবং মার্কিন ডিফেন্স সিস্টেমের পক্ষে তা ইন্টারসেপ্ট বা মাঝপথে আটকে দেওয়া জটিল করে তোলে। তবে ইরান এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সবাই নিশ্চিত নন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে হলে ইরানের ড্রোন-ঝাঁক প্রযুক্তিতে আরও বড় ধরনের বৈপ্লবিক অগ্রগতি প্রয়োজন। আবার অন্যদের মতে, অল্প কিছু ড্রোনও যদি প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে ইসরায়েলের ভেতরে আঘাত হানতে পারে, তবে তা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেবে। তাছাড়া, এই হামলাগুলো হতে পারে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করার একটি মহড়া, যেন ভবিষ্যতে বড় কোনো হামলায় সেগুলো কাজে লাগানো যায়। জর্দানের এই হামলাগুলো আসলে মার্কিন সম্পদ ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ। বাহরাইন, কুয়েত এবং সৌদি আরবেও একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও মার্কিন বিমান ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের বিষয়ে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কিছু দাবি এখনো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাল্টা জবাবে মার্কিন বাহিনীও হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলের হুমকি কমাতে ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। সব মিলিয়ে, এই সংঘাত এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক এক ধাপে প্রবেশ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের দিক পরিবর্তনের কৌশল, ড্রোনের ঝাঁক, কৌশলগত অবকাঠামোতে হামলা এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার এই সর্বাত্মক চেষ্টা নিশ্চিতভাবেই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের আগুনকে আরও উসকে দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিধ্বংসী ও ব্যাপক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।



