স্থানীয় সংবাদ

সোলায়মানের দখলে খুলনা বিআরটিসি’র ৪টি বাস!

দুর্নীতির বিষবৃক্ষ বিআরটিসি’র খুলনা ডিপো

. বছরে কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত সরকার
. খাতা কলমে বিআরটিসি’র চালকের নাম, অথচ চালান বহিরাগতরা
. খুলনা ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মোশারফ ও বর্তমান
ম্যানেজার কামরুজ্জামানের যোগসাজসের অভিযোগ

জামান ফকির : বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) খুলনা ডিপোতে শেঁকড় গেড়েছে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ। ফলে ইজারা ছাড়াই ডিপোর ৪টি বাস বর্তমানে মো. সোলায়মান নামে এক ব্যক্তির অবৈধ দখলে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে বেআইনী দখলে রেখে তিনি ভাড়াও প্রদান করছেন মর্জি মাফিক। এতে করে ওই ৪টি বাস থেকে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকারও বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
এদিকে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি বাস অবৈধ দখলে থাকলেও তা উদ্ধারের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। উপরন্তু দুর্নীতির এ মহা-কাব্যের সঙ্গে খুলনা ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মোশারফ ও বর্তমান ম্যানেজার কামরুজ্জামানের যোগসাজসের অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, বরগুনা জেলার পাথরঘাটা মানিকখালীর মতিয়ার রহমানের পুত্র মো. সোলায়ামান। তার বসবাস নগরীর সোলায়মান নগরস্থ মিনারা মসজিদ রোড এলাকায়। তিনি মেসার্স সায়ান মটরস নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। এক সময় ছিলেন বিআরটিসির বাস ড্রাইভার। আওয়ামীলীগের সময় হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান তিনি। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আপন চাচাত ভাই খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের সাথে গড়ে তোলেন গভীর সখ্যতা। এরই সূত্র ধরে ২০২২ সালের ২৭ মার্চ সালাহউদ্দিন জুয়েল ডিও লেটারের মাধ্যমে বিআরটিসি’র তৎকালীন চেয়ারম্যানকে সোলায়মান এর জন্য দুটি লং-লিজ বাস দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান (ডিও নং-খু-২/২২/৯। পরবর্তীতে সোলায়মান বাস লিজ পান।
এদিকে, ২৪’র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হওয়ার পর বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সারা বাংলাদেশে বিআরটিসির বাস লং-লিজ প্রথা বাতিল করেন। কিন্তু লিজ বাতিল হওয়ার পরেও অবৈধভাবে খুলনার বিআরটিসির ৪টি বাস দখলে নিয়ে মুন্সীগঞ্জ ও বরগুনা রুটে সোলায়মান তাঁর লোকবল দিয়ে পরিচালনা করে আসছেন। কারণ আওয়ামীলীগ সরকারের ক্ষমতার পতন হলেও সোলায়মানের ক্ষমতার পতন হয়নি। বরং রং বদল করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ছাঁয়াতলে আসার চেষ্টা করেন তিনি। খুলনা ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মোশারফ ও বর্তমান ম্যানেজার কামরুজ্জামানের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি লীজ ছাড়াই ৪টি বাস নিজ দখলে রেখে অর্থ কামাচ্ছেন।
অনুসন্ধান বলছে, বিআআরটিসির যে চারটি বাস সোলায়ামান নিজ দখলে রেখেছেন সেগুলোর চালক, হেলপার, সুপারভাইজার সবই তার নিজস্ব লোক। বাসগুলোর রেজিস্ট্রিশন নম্বর হলো যথাক্রমে- ঢাকা মেট্রো ব-১১-১৪২৪, ঢাকা মেট্রো ব-১১-২১৫৫, ঢাকা মেট্রো ব-১১-২১০৯, ঢাকা মেট্রো ব-১১-১৮৫২। এই বাসগুলোর মালিকানা বিআরটিসি’র হলেও সোলায়ামান এখন অঘোষিত মালিক বনে গেছেন। সোলায়ামানের পরিচালনাধীন একটি বাসের চালক মো. জয়নাল জানান, “আমি ১৪২৪ নম্বর গাড়ীর চালক, তার (সোলায়মানের) নির্দেশে বিআরটিসি’র এই বাস চালাই। এর বাইরে আর কিছু জানি না”। গত ২১ জুলাই সকাল ৬টায় সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানের খুলনা ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, খুলনা বিআরটিসি বাস ডিপোর মধ্যে থেকে ঢাকা মেট্রো ব-১১-২১৫৫ গাড়ীটি চালিয়ে নিয়ে বের হচ্ছেন বহিরাগত চালক জয়নাল। অথচ বিআরটিসির খুলনা বাস ডিপোর গেটে সিকিউরিটি গার্ড সূত্রে দেখা যায়, ওই ২১৫৫ গাড়ীটির চালক হিসেবে খাতা-কলমে নাম দেখানো হয়েছে বিআরটিসির চালক ইমরান মোল্যাকে। এ বিষয় বিআরটিসির চালক ইমরান মোল্যার সাথে কথা হলে তিনি জানান, তিনি কখনও ২১৫৫ নম্বর গাড়ীটি চালাননি। বরং ওই সময় তিনি তার তেরখাদা উপজেলায় অবস্থিত বাসায় অবস্থান করছিলেন। খুলনা বিআরটিসি বাস ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ওই চারটি বাস থেকে দৈনিক ৩ হাজার টাকার মত রাজস্ব পাচ্ছি। অথচ অন্যান্য ওই একই রুটে চলা বাস থেকে রাজস্ব আসছে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। তবে এক প্রশ্নের জবাবে এটি মহা অন্যায় বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, বাস যে এভাবে সোলায়ামান পরিচালনা করছে তা আমার জানা ছিলো না। তবে বিআরটিসি খুলনা বাস ডিপোর ক্যাশিয়ার নূরুজ্জামান বলেন, সাবেক ম্যানেজার মোশারফ স্যার থাকাকালীন সোলায়ামানকে এই সুবিধা দিয়েছিলো। যদিও বিআরটিসির খুলনার সাবেক ম্যানেজার মোশারফ মুঠোফোনে বলেন, তিনি সোলায়মান নামে কাউকে চিনেন না। অনুসন্ধানে আরও গভীরে যে দেখা যায়, বিগত এক বছর ম্যানেজার হিসেবে খুলনায় মোশারফ থাকাকালীন কোন প্রকার লিজ ছাড়াই সোলায়ামন তার লোকবল দিয়ে অবৈধভাবে গাড়ী চালিয়ে আসছে। এছাড়া বর্তমান খুলনা ডিপোর ম্যানেজার কামরুজ্জামান যোগদান করার পর থেকেই সোলায়মানের বিষয় অবগত ছিলেন। অথচ: তিনি সোলায়ামানের নিকট থেকে বাস উদ্ধারের বিষয় কোন আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিআরটিসি খুলনা বাস ডিপোর গেটের নিরাপত্তা প্রহরী থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সকলই সোলায়মানের গল্প জানেন। তবে ভাগ বাটোয়ারার হিস্যা সকলে পান না। ম্যানেজার, ক্যাশিয়ারসহ হাতে গোনা কয়েকজন সোলায়ামানের বিষয়টি দেখভাল করেন বলে তথ্য উঠে এসেছে। এ বিষয় বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, তিনি যোগদানের পর ইজারা প্রথা বাতিল করেছেন। তবে, খুলনার এ বিষয়টি তিনি অবগত নন, তবে তথ্য প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। লীজ ছাড়াই গাড়ি নিজ দখলে রেখে পরিচালনার বিষয়টি অস্বীকার করে মো. সোলায়মান এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি এক সময় বিআরটিসি’র গাড়ী লীজে চালাতেন। কিন্তু এখন চালান না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে এ প্রতিবেদকের পরিচয় পূণরায় জানতে চেয়ে আধাঘন্টা পরে ফোন ব্যাক করার কথা বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যদিও তিনি আর কল ব্যাক করেননি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button