বাংলাদেশে কয়লা বেচে ‘জীবন কয়লা’ সিঙ্গাপুরের কোম্পানির

# সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে এলসি জালিয়াতি, দুই কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত #
# সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে এলসি খুলে মেসার্স কাজী এন্টারপ্রাইজ ৫৫ হাজার টন কয়লা আমদানি করে #
# কয়লার সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ না করলেও ব্যাংকের শাখা থেকে শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় করায় ৩০ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়ে যায় #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ শরিয়াহভিত্তিক সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলে বাংলাদেশের এক গ্রাহক সিঙ্গাপুরের ওয়েলহান্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টন স্টিম কোল বা কয়লা আমদানি করে। ব্যাংকের গাফিলতিতে এক বছরের বেশি সময় ধরে ওই কয়লার দাম পাচ্ছে না সিঙ্গাপুরের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। এলসির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি ওই সরবরাহকারী কয়লার দাম বাবদ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কাছে ৩০ কোটি ১ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ওই টাকা আদায়ে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও যখন কোনো ফায়দা হয়নি, তখন কোম্পানিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবগত করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনাটি তদন্ত করে এর সত্যতা পায়। তদন্তে বেরিয়ে আসা তথ্যে দেখা যায়, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির (এসআইবিপিএলসি) সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা তাদের গ্রাহকের কাছ থেকে আমদানির টাকা না নিয়েই শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় করেন। এতেই গ্রাহক এলসির বকেয়া টাকা পরিশোধ না করে বন্দর থেকে কয়লা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে, ব্যাংক আর কোনোভাবেই ওই গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারে না। ঘটনাটি ঘটেছে এসআইবিপিএলসির খুলনা শাখায়। ওই শাখার গ্রাহক মেসার্স কাজী এন্টারপ্রাইজ খুলনার একটি পরিচিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক কাজী মিজান। তার বাবা কাজী সোবহান ও অন্যান্যরা মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। খুলনায় তাদের একটি বড় ফুয়েল স্টেশনও রয়েছে। ব্যাংকের এলসির শর্ত অনুযায়ী, ৩০ কোটি ১ লাখ টাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে জমা দিয়ে তারপর শিপিং ডকুমেন্ট পাওয়ার কথা ছিল কাজী এন্টারপ্রাইজের। এরপর সেই কয়লা বিক্রি করে মুনাফা করার উদ্দেশ্যে এই কয়লা আমদানি করে কাজী এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু এলসির বকেয়া টাকা না দিয়ে শিপিং ডকুমেন্ট হাতে পেয়ে কয়লা বিক্রি করেও ব্যাংকের টাকা দিতে টালবাহানা শুরু করে মেসার্স কাজী এন্টারপ্রাইজ। এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এসআইবিপিএলসি এখন ৩০ কোটি টাকার দায়ও নিজের তহবিল থেকে পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে মাসের পর মাস সিঙ্গাপুরের ওই কয়লা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে কয়লার দাম না দিয়ে ঘোরাতে থাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অবশেষে বাধ্য হয়ে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস বিভাগের (এফআইসিএসডি) পরিচালকের কাছে অভিযোগ দাখিল করে ওয়েলহান্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড। অভিযোগ পেয়ে এফআইসিএসডি এসআইবিপিএলসিতে একটি নিরীক্ষা দল পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে। তদন্তে এসআইবিএলের খুলনা শাখার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা ও ব্যাংকের নিয়মাচার অনুসরণের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া এলসির বকেয়া টাকা আদায় না করে অরিজিনাল শিপিং ডকুমেন্ট রিলিজ করে দেওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আইনেরও লঙ্ঘন হয়। ফলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে বকেয়া টাকা ছাড়াই শিপিং নথিপত্র ছাড় করার অভিযোগে এসআইবিপিএলসি খুলনা শাখার তৎকালীন শাখা প্রধান এবং বিদেশি মুদ্রা ইনচার্জকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে শিপিং নথিপত্র ছাড় করে মেসার্স কাজী এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ওই দুই কর্মকর্তা কোনো আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না তা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য এ ধরনের কিছু ঘটে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শাখার অন্যান্য কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসআইবিপিএলসি খুলনা শাখার এক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়ে একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে পরিচালিত হলেও অনেক কর্মীর মনে স্বস্তি নেই। কারণ ৫টি ব্যাংকের সব কর্মীর চাকরি একটি সম্মিলিত ব্যাংকে হবে কি না তা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। এ কারণে অনেকে কর্মী অন্য ব্যাংকে চলে যেতে চেষ্টা করছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ব্যাংকে অনিয়ম করে অনৈতিকভাবে অর্থের মালিক হওয়া যায়। এরপর চাকরি না থাকলেও অনেক কর্মীর কিছু আসে যায় না। এদিকে এসআইবিপিএলসি এখন একজন প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকটির প্রশাসক মো. আবুল বাশার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক। গত মে মাসে তাকে এই ব্যাংকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসআইবিপিএলসির খুলনা শাখার এলসি সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে প্রশাসকের বক্তব্য চাওয়া হলে ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে বাংলানিউজকে একটি লিখিত বক্তব্য দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ‘এসআইবিপিএলসির খুলনা শাখার প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে খুলনা শাখা মেসার্স কাজী এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে মোট ৪৭ লাখ ২ হাজার ৫০০ ডলার মূল্যের পাঁচটি এলসি খোলে। এর মধ্যে একটি এলসির বিল পরিশোধ করা হলেও অবশিষ্ট চারটি এলসির ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ কোটি ১ লাখ টাকার মার্জিন আদায় না করেই শাখার কর্মকর্তারা মূল শিপিং নথি অবমুক্ত করেন, যার ফলে বৈদেশিক অর্থপরিশোধে অনিষ্পন্ন থেকে যায়। বিষয়টি পরবর্তীতে বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলহান্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের অভিযোগে প্রকাশ পায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় তদন্তে এ অনিয়মের সত্যতা প্রতীয়মান হয়।’



