মণিরামপুর পৌর এলাকায় পাঁচ কোটি টাকায় গৃহীত বস্তি উন্নয়নের ‘লিনিক’ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

মোঃ আব্বাস উদ্দীন, মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি ঃ মণিরামপুর পৌরসভায় বাস্তবায়নাধীন পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে দারিদ্র হ্রাসসকরণ ও বস্তি উন্নয়নের ‘লিনিক’ প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিন্ম আয়ের কমিউনিটি ও বস্তি এলাকায় এসব উন্নয়ন কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটি করা হচ্ছে অভিজাত ও সাধারন এলাকায়।
এই প্রকল্পে প্রয়োজন মাফিক আরসিসি ফুটপথ ও ড্রেন নির্মানের কথা থাকলেও বিগ বাজেটে মাত্র পাঁচটি ড্রেন ও ১৭ টি আরসিসি রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ১১ সদস্য বিশিষ্ট স্থানীয় নিন্ম আয় কমিউনিটি উন্নয়ন কমিটি বা লিনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। পৌরসভার একজন কর্মচারীকে সদস্য সচিব করে স্থানীয় পর্যায়ে চেয়ারপার্সনসহ কমিটির বাকী সদস্যরা সবাই নারী। কিন্তু বাস্তবে খাতা-কলমে কমিটি থাকলেও কমিটির সদস্যরা প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, মণিরামপুর পৌরসভায় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ওটএওচ)’র আওতাধীন দারিদ্র হ্রাসকরণ ও বস্তি উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে লিনিক প্রকল্পে পাঁচটি বস্তি উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। পাঁচ প্রকল্পে ধাপে ধাপে মোট পাঁচ কিস্তিতে কাজ সম্পন্নের কথা রয়েছে। পাঁচটি প্রকল্প হলো মহাবেদপুর দাসপাড়া, দূর্গাপুর মহলদার পাড়া, তাহেরপুর মন্ডল পাড়া, জুড়ানপুর ও বিজয়রামপুর। পাঁচটি এলাকার জন্য পাঁচটি লিনিক কমিটি করা হয়েছে।
লিনিক কমিটির সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে পৌরসভার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদারী নিয়েছেন। তারা ইচ্ছামত আরসিসি ড্রেন ও ফুটপথের রাস্তা নির্মান করছেন। আর এ সব কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দূনীতির অভিযোগ উঠেছে। কাজ বাস্তবায়নের ব্যয় নির্বাহে ইতিমধ্যে দুই কিস্তির মধ্যে এক কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। লিনিক কমিটির চেয়ারপার্সন ও সদস্য সচিবের যৌথ স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করা হলেও অধিকাংশ সদস্যরা এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। লিনিক কমিটির সদস্যরা এমন অভিযোগ করেন।
অভিযোগে আরও জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প কমিটির চেয়ারপার্সনের নেতৃত্বে অন্যান্য সদস্যরা বিভিন্ন নির্মান সামগ্রি ক্রয় করে বাস্তবায়ন করবেন এবং তা দেখভাল করবেন পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে খাতা-কলমে লিনিক কমিটি করা হলেও চেয়ারপার্সনসহ অধিকাংশ সদস্যরা এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্মান সামগ্রি ক্রয় করে মূলত: কাজসমুহ বাস্তবায়ন করছেন পৌরসভার কার্যসহকারি তপু এস,এম আব্দুর রশিদসহ কয়েকজন কর্মচারী। প্রতি কিস্তির কাজ সম্পন্নের পর কমিটির চেয়ারপার্সন ও সদস্য সচিবদের যৌথ ব্যাংক একাউন্টে বরাদ্দের জমাকৃত টাকা উত্তোলনের সময় তাদের কাছ থেকে চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে প্রথম কিস্তির কাজ সম্পন্ন হয়ে দ্বিতীয় কিস্তির কাজ চলমান রয়েছে। এ দুই কিস্তির পাঁচ প্রকল্প থেকে ইতিমধ্যে এক কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মহাদেবপুর দাসপাড়া প্রকল্পের লিনিক কমিটির চেয়ারপার্সন পূর্নিমা রানী, বিজয়রামপুরের চেয়ারপার্সন বিউটি বেগম, জুড়ানপুরের চেয়ারপার্সন পাপিয়া সুলতানা জানান, কমিটিতে আছি ঠিকই। তবে প্রকল্পের সব কাজ করছেন ঠিকাদার তপুভাই। খোঁজখবর নিয়ে পৌর সভার কার্যসহকারি তপু এস,এম আব্দুর রশিদ কাজসমুহ বাস্তবায়ন করছেন এমনই তথ্য পওয়া গেছে। বিজয়রামপুর লিনিক কমিটির সদস্য সচিব পৌরসভার উচ্চমান সহকারি শিরিনা খাতুন জানান, তিনি কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে এ কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেননা। জুড়ানপুর প্রকল্পের সদস্য সচিব পৌরসভার টিকাদান সুপারভাইজার বিউটি রানী বিশ^াস ও একই কথা বলেন।
এদিকে আরসিসি ফুটপথ ও ড্রেন নির্মানে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আরসিসি ফুটপথে(রাস্তাা) চার ইঞ্চি পাথরের ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি। আবার নি¤œমানের সামগ্রি ব্যবহার করায় নির্মিত ড্রেন ও রাস্তার ঢালাই হাত দিয়ে উঠিয়ে ফেলছেন স্থানীয়রা। অতিসম্প্রতি এ প্রকল্পের বিজয়রামপুরে নির্মিত ফুটপথ ও ড্রেন পরিদর্শনে আসেন আইইউজিআইপি প্রকল্পের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উচ্চ পর্যায়ের এ কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে চার ইঞ্চি ঢালাইয়ের পরিবর্তে পেয়েছেন আড়াই ইঞ্চি। এ ছাড়া ড্রেন ও স্লাপ নির্মানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে তাঁরা মন্তব্য করে গেছেন । ফলে উর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তারা প্রকল্পের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে পুনরায় সঠিকভাবে কাজ সম্পন্নের নির্দেশনা দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে সেই কাজ এখনও করা হয়নি।
পৌরসভার কার্যসহকারি ও মহাদেবপুর লিনিক কমিটির সদস্য সচিব তপু এস,এম আব্দুর রশিদ বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
পৌরসভার প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তম মজুমদার বলেন, কোন প্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতি ছাড়াই লিনিক প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. স¤্রাট হোসেন বলেন, লিনিক কমিটির যৌথ একাউন্ট থেকে এ কাজের বিল হিসেবে এক কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন সংশ্লিষ্টরা । আমার কোন স্বাক্ষর লাগেনা। তিনি বলেন, কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



