খুলনায় ছাত্র-জনতার আগুনঝরা প্রতিরোধের দিন

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলি-৩৩
এম সাইফুল ইসলাম ঃ ২০২৪ সালের ২ আগস্ট, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এদিন খুলনায় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ নতুন মাত্রা পায়। দুপুরের পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নগরীর রাজপথ। জুমার নামাজ শেষে নানা বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে জিরো পয়েন্টে সমবেত হন।
বিকেলের আগেই গল্লামারী থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে এসবের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান ধরে রাখেন। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলার একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
জুলাই আন্দোলনে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল খুলনা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), সরকারি বিএল কলেজ, আজম খান সরকারি কমার্স কলেজ, সুন্দরবন আদর্শ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ফলে জুলাই-আগস্টজুড়ে খুলনার রাজপথ ছিল আন্দোলনের উত্তাপে মুখর।
তবে ২ আগস্টের এই প্রতিরোধ ছিল পুরো জুলাই মাসের ধারাবাহিক আন্দোলনেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মাসজুড়ে গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও ছাত্র-জনতা আন্দোলন চালিয়ে যান। শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়কÑসবখানেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ ছিল প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা।
১৯ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করলে সেখানে পুলিশ বাধা দেয়। ২২ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের একাধিক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
৩১ জুলাইও খুলনার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। সেদিন পুলিশের অভিযানে শতাধিক আন্দোলনকারীকে আটক করা হয় বলে আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। একই রাতে সার্কিট হাউসে তৎকালীন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, সংসদ সদস্য এস এম কামালসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বিবৃতি নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সে সময় পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনকারীদের দাবি, হামলা, মামলা ও হুমকির মুখেও রাজপথ ছাড়েননি তারা। তাদের মতে, ২ আগস্টের প্রতিরোধের পর খুলনার আন্দোলনে নতুন গতি আসে এবং পরবর্তী সময়ে নগরীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় আন্দোলনের সময় তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও কেউ কেউ স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান বা পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে খুলনার অন্তত ছয়জনের নাম উঠে আসে। তাদের পরিবারগুলো আজও স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে।
২ আগস্টের প্রতিরোধ খুলনার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই দিনের সংঘর্ষ, সাহসিকতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিতে আজও গভীরভাবে স্মরণীয়।



