জাতীয় সংবাদ

খালাস পাওয়া ‘বোমারু’ মামুনের খোঁজে পুলিশ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রাজধানী, আশুলিয়া ও সাভারসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনকে’ খুঁজছে পুলিশ। নয় বছর আগে জঙ্গিবাদের অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মামুন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পান। ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও বোমা হামলা মামলায় মামুনসহ সব আসামিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে খালাস দেন আদালত। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সূত্র বলছে, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে সাভার থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের গুরু মামুন। আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বাসায় অভিযান চালানোর পর মামুনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। সূত্রটি বলছে, আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে একটি নাম উঠে আসে, নাজমুল হাসান মামুন। পুলিশের খাতায় যার নাম বোমারু মামুন। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, শ্যামপুরের ঘটনায় উগ্রবাদী বোমারু মামুন ও আরিফসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। এছাড়া গতকাল বুধবার (১২ আগস্ট) বোমা পাওয়ার ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়েছে। উগ্রবাদী আরিফের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে সাভারে বোমা উদ্ধার, রাতভর অভিযান ঃ ঠিক আগের দিন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুরে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়ি ঘিরে রাখে ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিট। খবর ছিল, ভেতরে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী অবস্থান করছে এবং সেখানে প্রচুর বিস্ফোরক আছে। এর আগে সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্য মোহাম্মদ আরিফের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান চালানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ তার ভাড়া বাসার ঠিকানা এবং সেখানে আরও কিছু বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম থাকার তথ্য দেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসি ও ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট শ্যামপুরে অভিযান চালায়। সেখানে আরও বোমা পাওয়া যায়, যা রাতভর নিষ্ক্রিয় করা হয়। এদিকে গতকাল বুধবার ঢাকার সাভারে আবারও বোমা যায়। একটি নীল প্লাস্টিকের ড্রাম, ভেতরে কাপড়চোপড়, আর তার মধ্যে লুকানো ছিল প্রেসার কুকার বোমা। একজন কর্মকর্তা পুলিশ বলছেন, বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট আওয়াজের মাত্রা অনেক জোরালো ছিল। এছাড়া বোমায় ছোট ছোট লোহা জাতীয় জিনিসগুলো বিস্ফোরণের সময় ভয়ংকরভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। এর বিস্ফোরণ জনসমাগমে ঘটলে বহু হতাহতের আশঙ্কা থাকে। সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় মঙ্গলবার রাতে তিনজন অচেনা ব্যক্তি বোমাটি সেখানে রেখে গিয়েছিল। বুধবার সকাল ৮টায় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। কে এই বোমারু মামুন? ঃ ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মামুনকে। তখন তিনি একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর নব্য নেতা। এরপর মামলা চলেছে-কিন্তু এই বছরের ৫ জানুয়ারি সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামুনসহ ১৪ আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দেন বলে জানা যায়। মামলা খালাসের আগে মামুন কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। মামলাটি ছিল ২০১৭ সালে পান্থপথের ওলিও হোটেলের ঘটনা নিয়ে, যেখানে সোয়াটের অভিযানের মুখে সাইফুল ইসলাম নামে একজন যুবক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় হোটেলের দেয়াল আর রেলিং রাস্তায় ভেঙে পড়ে। পুলিশ বলছে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্য মামুন ২১ বছর বয়সেই বোমা তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তার বানানো বোমার আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হন। সিটিটিসি বলছে, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মামুন নতুন করে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার কাজে নামেন। দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জকে বানান নিজের সদর দপ্তর। কেরানীগঞ্জ থেকে যে সূত্র ধরে এগোলো তদন্ত ঃ গত ডিসেম্বরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিংয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় বিস্ফোরণের তদন্তেই বেরিয়ে আসে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সন্ধান। বিস্ফোরণে মাদরাসার চারপাশের দেয়াল আর ছাদের কিছুটা ধসে পড়েছিল। দুই দিনের অভিযানে সেখান থেকে মেলে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড, ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, আর কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো ৯টি তাজা ককটেল। ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার হন মাদরাসার পরিচালক বাগেরহাটের মোল্লারহাটের শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলাম। এর আগে বিস্ফোরণের সময় গ্রেপ্তার হন তার স্ত্রী আছিয়া, আছিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার এবং আসমানী। তার আগে জানুয়ারির শেষে গ্রেপ্তার হন যশোরের আব্দুর রহমান। তার দেওয়া তথ্যে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) অভিযান চালায় যশোরের বাঘারপাড়ার দড়িআগড়া গ্রাম রায়হান উদ্দিনের বাড়িতে। সেখান থেকে পাওয়া যায় গ্রেনেড, ৪টি পিস্তল, ৩৯ রাউন্ড গুলি, ৭৪টি বোমা, ওয়াকিটকি, সিসি ক্যামেরা। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে, অভিযুক্তরা সবাই একে অপরের আত্মীয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, রায়হান, হাফিজ ইব্রাহিম, আল-আমিন আর আবদুর রহমান, বাগেরহাটের ফকিরহাটের সাতবাড়িয়া গ্রামে গোপন সভা করতেন। সেখানেই নিতেন অস্ত্র আর বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ। বরিশালে বিস্ফোরণে দগ্ধ হনুফার মৃত্যু ঃ গতকাল বুধবার সাভারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বিস্ফোরণে খবর আসে বরিশাল থেকে। সকাল পৌনে ১১টায় বরিশাল জেলা জজ আদালত চত্বরে ঘটে বিস্ফোরণটি।বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সুশান্ত সরকার সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা যাবে। এদিকে গত ৩ আগস্ট ভোরে ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামের একটি বাড়ির উঠানে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে হনুফা বেগম (৫০) নামে এক নারী, তার মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) ও নাতি ফাহিম (১৫) দগ্ধ হন। বুধবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হনুফার মৃত্যু হয়। ঢাকা থেকে যাওয়া পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের প্রাথমিক তদন্তে বিস্ফোরণে আইইডি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। বিস্ফোরকটি সক্রিয় করতে ‘বুবি ট্র্যাপ’ ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button