সম্পাদকীয়

নদীর বালুকণায় অপার সম্ভাবনায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন

আজকের দুনিয়ায় প্রযুক্তিই যেন সবকিছুর পরিচালক। ইলেকট্রনিক ডিভাইস ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও প্রায় অসম্ভব। আর এসব ডিভাইসসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির ‘হৃদপি-’ হলো সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। বলা যায়, প্রযুক্তি দুনিয়ার পুরোটাই চিপনির্ভর। এই চিপ তৈরিতে প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বালু। আশার কথা হলো, গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের নদ-নদীতে প্রতিবছর মূল্যবান কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বালু জমা হয়। বলা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় গবেষণা ও সঠিক রোডম্যাপ অনুযায়ী অগ্রসর হলে আগামী দিনে এই মাইক্রোচিপ শিল্প হতে পারে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশ্বে প্রতিদিনই মাইক্রোচিপের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে এই বাজার প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরই এই বাজার এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কেননা অদূরভবিষ্যতে শাসন করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভজি-সিক্সজি ও বিদ্যুত্চালিত গাড়ির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলো। চাহিদা বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তাইওয়ানের মতো দেশগুলো চিপ উৎপাদনে কোটি কোটি ডলার ভর্তুকি ও কৌশলগত ছাড় দিচ্ছে। অথচ বিপুল সম্ভাবনার এই বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একেবারেই সামান্য। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে বাংলাদেশ বার্ষিক মাত্র ৫০ লাখ ডলার আয় করে, যার বেশির ভাগ আসে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন সেবার মাধ্যমে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নদ-নদীর বালুতে চিপ তৈরির কাঁচামাল সম্ভাবনা যাচাইয়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো জরিপ চালানো হয়েছে। দেশের আটটি প্রধান নদীব্যবস্থার পাঁচ হাজার ৪৮১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছয় হাজার ৬০০টির বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ৮০০টির বেশি নমুনার পেট্রো-মিনারেলজিক্যাল, রাসায়নিক ও ভৌত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের (জিএসবি) সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও তিস্তা নদী অববাহিকায় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) টনেরও বেশি বালুসম্পদ রয়েছে। এই বালুর গড়ে প্রায় ২৮.৭ শতাংশই হলো কোয়ার্টজ বা সিলিকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত শোধনপ্রক্রিয়ায় দেশের নদীর বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সিলিকা নিষ্কাশন করা সম্ভব। তবে মাইক্রোচিপ তৈরিতে ‘ইলেকট্রনিক গ্রেড পলিসিলিকন’-এর বিশুদ্ধতা হতে হয় ৯৯.৯৯৯ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্যে পৌঁছতে আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। সম্প্রতি ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাত।’ তিনি বিশ্বাস করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে নির্ধারিত রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এই শিল্পে আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, তবে চ্যালেঞ্জও কম নেই। দেশে এই শিল্পের পথপ্রদর্শক প্রতিষ্ঠান ‘উলকাসেমি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশে কম পরিচালন ব্যয় এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রকৌশলী সম্ভাবনা বড় সুবিধা হলেও ভারত, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নীতিগত সহায়তায় এখনো পিছিয়ে আছে। আমরা মনে করি, মাইক্রোচিপ শিল্পের জন্য আমাদের নদ-নদীর বালুকণায় যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা যথাযথ মূল্যায়নে আরো বিস্তর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্য হয়তো এখনো অনেক দূরে, কিন্তু তা অর্জনে সব সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে। যুগের চাহিদা বিবেচনায় সরকার এ বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবেÑএটাই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button