জাতীয় সংবাদ

চট্টগ্রামে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত বেড়ে ৯

নিহতদের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

প্রবাহ রিপোর্ট : চট্টগ্রামের সীতাকু-ে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
এর আগে আজ (শুক্রবার) সকাল ১০টার দিকে ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে হাউসকিপিংয়ের কাজ করার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) জুনায়েত কাউছার জানান, দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৯ জন মারা গেছেন।
নিহতরা হলেন মো. রানা (২৫), খোকন (২৬), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। হাবিবুর রহমান (৫০) নামে একজন নিহতের তালিকায় থাকলেও তাঁর মরদেহ ও পরিচয় পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকরা ইয়ার্ডে কাজ করার সময় হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে ১৫-২০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রথমে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, হতাহতদের অনেকে শ্রমিক নন, উৎসুক জনতা। তিনি বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। সকাল ১০টার দিকে একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে লিকেজ হয়। স্থানীয় অনেকে বিষয়টি দেখতে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন।
ইয়ার্ডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান বলেন, এখানে বিস্ফোরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। গ্যাস লিক হয়ে বিষক্রিয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। অনেকে প্রথমে এটিকে বিস্ফোরণ বলে মনে করেছিলেন।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহবুবুল হাসান বলেন, ১০ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। বাকিদের সর্বশেষ অবস্থা এখনো জানা যায়নি। গ্যাস নির্গমন নাকি বিস্ফোরণ, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম হতাহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ২ জনের মরদেহ জাহাজভাঙা কারখানায় রয়েছে। অন্য ৬ জনের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তৌফিকুল ইসলাম আরও জানান, ‘হতাহতের ঘটনা ঘটে যে স্ক্র্যাপ জাহাজে, সেটি ছিল এলএনজি বহনকারী জাহাজ। এই ধরনের জাহাজে কাটিং কাজ শুরুর আগে গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা না করে কাটিং কাজ করায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সাগরে জোয়ারের কারণে উদ্ধার কাজ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। জোয়ারের পানি নেমে ভাটা এলে আবার উদ্ধারকাজ শুরু হবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, হাসপাতালে আহত ৬ শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহত ৫ জনের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, ভাটিয়ারি স্টেশন রোড-সংলগ্ন সাগর উপকূলে মো. লোকমানের মালিকানাধীন জাহাজভাঙা কারখানার ওই স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে লিকেজ হওয়া গ্যাসের তীব্রতা ব্যাপক ছিল। গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা কারখানা-সংলগ্ন খালে মাছ ধরার নৌকা ভিড়াতে পারেননি। খাল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নৌকা ভিড়াতে হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের চিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে যান। এ সময় হতাহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁরা জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
সীতাকু- থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হতাহতের ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা ওই জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘স্ক্র্যাপ জাহাজের কাটিং কাজের সময় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অসাবধানতাবশত গ্যাস লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম জানান, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আর কোনো শ্রমিক হতাহত হয়েছেন কি না, তা ভাটার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মাধ্যমে আবার তল্লাশি চালিয়ে দেখা হবে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
নিহতদের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা : চট্টগ্রামের সীতাকু-ে শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন। একইসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় মন্ত্রী আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিহতদের পরিবারকে মালিকপক্ষের সংগঠনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান (কমপ্লায়েন্স) নিশ্চিত করার ওপর সরকারের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিল্প খাতের কমপ্লায়েন্সের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের গ্রেডিং ও সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মানদ- অনুসরণ করা হয়। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্সের কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। ঘাটতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও চেম্বার পরিচালক এসএম সাইফুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, এদিন সকালে সীতাকু-ের একটি শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। এতে আট শ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হলে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button