স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় ওএমএসের চাল-আটা বিক্রি বন্ধ : বিপাকে নিম্ন আয়ের ৫ হাজার মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার ঃ ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে খুলনার ৫ হাজার দরিদ্র মানুষ। সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় ক্রিসেন্ট জুট মিল গেটের পশ্চিম পাশে একটি ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে চাল না পেয়ে হতাশ আশরাফ আলী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “এখান থেকে চাল নিয়েই সংসার চালাই। চাল বন্ধ করে দিলে বাঁচব কিভাবে?” শুধু আশরাফ নন, একই চিত্র দেখা গেছে খুলনা মহানগরীর ১৬টি ওয়ার্ডে। হঠাৎ করে ওএমএস’র চাল ও আটা বিতরণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকে বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে পণ্য না পেয়ে ফিরে গেছেন নিম্নআয়ের অসংখ্য মানুষ। কারও হাতে টাকা থাকলেও মিলছে না চাল, আবার কেউ দিনের খাবারের হিসাব মিলাতে না পেরে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর ৭, ৮, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কোনো পয়েন্টেই সোমবার(২৪ আগষ্ট) ওএমএস’র চাল-আটা বিতরণ হয়নি। এতে প্রায় পাঁচ হাজার ভোক্তা পণ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। একই সঙ্গে এসব পয়েন্টে কর্মরত অন্তত: ৮০ জন কর্মীর পরিবারেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। চাল-আটার জন্য ট্রেজারি চালান জমা দিয়েও পণ্য না পাওয়ায় জটিলতায় পড়েছেন ডিলাররাও। ওএমএস পয়েন্টে চাল নিতে আসা রিনি জানান, তার স্বামী একসময় জুটমিলে শ্রমিক ছিলেন। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন ভ্যান চালান। দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। স্বামীর আয়ে সংসার চলে না বলে তিনি ও তার শাশুড়ি বাসাবাড়িতে কাজ করেন। দিনের কোনো এক সময়ে ওএমএস’র চাল নিয়ে রান্না করেন তারা। কিন্তু সোমবার সকালে পয়েন্টে গিয়ে জানতে পারেন চাল দেওয়া হবে না। এতে হতাশ হয়ে ফিরে যান তিনি। একসময় পিপলস জুটমিলে চাকরি করা মোহাম্মদ দুলাল এখন শিববাড়ী মোড়ে নাইট গার্ডের কাজ করেন। তার ভাষায়, “মাত্র ২০ টাকা সাশ্রয়ের জন্যও আমরা লাইনে দাঁড়াই। এই পয়েন্ট বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের যাওয়ার পথ থাকবে না।” সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওএমএস বন্ধের নেপথ্যে রয়েছে ডিলারশিপ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা। ২০২৪ সালে ২০১২ ও ২০১৫ সালের ওএমএস নীতিমালা বাতিল করে নতুন নীতিমালা জারি করার পর খুলনায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এর প্রেক্ষিতে খুলনার ১৬ জন ডিলার হাইকোর্টে রিট করেন। যার রিট পিটিশন নম্বর ১৩৯০৩/২০২৪। ওই রিটের পর ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর বিচারপতি মো. আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি কে. এম. রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পূর্ব নোটিশ ছাড়া খুলনা মহানগরীর ওএমএস ডিলারদের ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। এরপর একাধিকবার ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট আরও আড়াই মাসের জন্য স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে বলে আদালতের দেওয়া আদেশে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, ২৪ আগস্ট ওএমএস বন্ধ হওয়ার দিনও আদালতের স্থগিতাদেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু তারপরও খুলনা মহানগরীর ১৬টি ওয়ার্ডে চাল-আটা বিতরণ বন্ধ হয়ে যায়। রিটকারী ১৬ ডিলারের পক্ষে সাঈয়েদুজ্জামান মোল্লার দাবি, হাইকোর্টের আদেশের অনলাইন ও সার্টিফায়েড কপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়ে গ্রহণ করানো হয়েছে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী ট্রেজারি চালান জমা দেওয়ার পরও ডিলারদের পণ্য তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে আদালতের আদেশ রয়েছে। গত প্রায় দুই বছর হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এরপরও অন্যান্য ডিলার মাল তুলতে পারলেও খুলনার ১৬ জন ডিলার কেন বাদ পড়লেন, সেটিই প্রশ্ন।” তার দাবি, একটি ওএমএস পয়েন্টের সঙ্গে শুধু একজন ডিলার নয়, শত শত ভোক্তা এবং একাধিক পরিবারের জীবিকা জড়িত। কার্যক্রম বন্ধ থাকলে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম জানান, আদালতের আদেশটি সঠিক কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় আইন উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর চাল-আটা বিতরণের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের প্রস্তুতি আছে। তবে এই ব্যাখ্যায় স্বস্তি মিলছে না নিম্নআয়ের মানুষের। কারণ আইনি জটিলতার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওএমএস বন্ধ রাখার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের দৈনন্দিন খাবারের ওপর। রিটের নথি অনুযায়ী, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবরের স্মারকের মাধ্যমে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ওএমএস কর্মসূচির আওতায় নিয়োজিত ডিলারদের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। পরে খুলনা মহানগরীতে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে পুরোনো ডিলাররা আদালতের দ্বারস্থ হন। তাদের অভিযোগ, বৈধ লাইসেন্সের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করার পরও কোনো নোটিশ, শুনানি বা বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। রিটে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক, জেলা প্রশাসক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বিবাদী করা হয়।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button