পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

স্টাফ রিপোর্টার : হিজরি ১৪৪৮ সালের ১২ রবিউল আউয়াল আজ। দেশজুড়ে যথাযথ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। আরব সমাজের ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা অন্ধকার যুগ থেকে মানবকুলের মুক্তি ও আলোর পথ দেখাতে মহান আল্লাহ তা’আলা আজকের দিনেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পৃথিবীতে শেষ নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। যার জীবনাদর্শই (সুন্নাহ) পরবর্তীতে হয়ে ওঠে ইসলামের মূল ভিত্তি, মুসলিম উম্মাহর পাথেয়।
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মানবজাতির রহমত স্বরূপ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আরবের মক্কা নগরের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের ঘরে, মা আমিনার কোলে জন্ম নেন। প্রতি হিজরি বর্ষের তৃতীয় মাস ‘রবিউল আউয়াল’-এর ১২ তারিখটি তাই মুসলমানদের ঘরে ঘরে নবী মুহাম্মদের জন্মক্ষণকে পবিত্র দিন হিসেবে পালন করা হয়।
মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মের আগেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি মাকেও হারান। এরপর তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব এবং দাদার মৃত্যুর পরে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হন। ২৫ বছর বয়সে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাদিজা (রা.) নামের এক সম্ভ্রান্ত নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
মহানবী (সা.) অল্প বয়স থেকেই হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ’র ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। আনুমানিক ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, হেরা গুহায় অবস্থানকালে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) মুহাম্মাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি বা বাণী পৌঁছে দেন। এরপর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ করে গেছেন।
রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ঠিক একই তারিখে, অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন তিনি।
আল কুরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের গুরুত্ব: মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, হে প্রিয় হাবীব আপনি বলে দিন, তারা যেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে খুশি উদযাপন করে উক্ত খুশি ও আনন্দ তাদের সমুদয় সঞ্চয় থেকে অতি উত্তম। উপরে বর্ণিত আয়াত সমূহে যেরূপভাবে নেয়ামতের র্চচা ও স্মরণ করার উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অত্র আয়াতে দয়া, অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে খুশী উদযাপনের নির্দেশ রয়েছে। প্রিয় নবী যে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর রহমত, এতে মুসলিম মিল্লাতের কোন দ্বিমত নেই। অত্র আয়াতে যদি ফজল ও রহমত দ্বারা অন্য কিছু উদ্দেশ্য করা হয় তাও হুজুরের ওসীলায় সৃজিত। সর্বাবস্থায় প্রিয় রাসুলের পবিত্র সত্তা আল্লাহ পাকের সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত হওয়া প্রমাণিত। উভয় জাহানে তারই রহমতের বারিধারা প্রবাহিত, সুতরাং তাঁর গুণগান শান মান মর্যাদা ও মাহাত্ম্য স্মরণ করা ও আলোচনা করা বিধাতার আনুগত্যের নামান্তর, পক্ষান্তরে এর বিরোধিতা করা অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক।
হাদীস শরীফের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য: হযরত কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, প্রিয় রাসুলের কাছে সোমবার দিবসে রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে প্রিয় নবী এরশাদ করেন, ফিহী উলিদতু ওয়াফিহী উনযিলা আলাইয়্যা অর্থাৎ এ দিনেই আমি আবির্ভূত হয়েছি এবং এদিনেই আমার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।(মিশ্কাত শরীফ ১৭৯ পৃষ্ঠা) প্রিয় নবীর উপরোক্ত হাদিস থেকে মিলাদুন্নবী তথা প্রিয় নবীর জন্ম দিবস ও নুযুলে কুরআন দিবসের গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিবসের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন ও নেয়ামত প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রোজা পালনের বৈধতা প্রমাণিত হলো। সুতরাং সাপ্তাহিক হিসেব অনুসারে প্রতি সোমবার যেমনি মুসলমানদের নিকট ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাখে তেমনি বার্ষিক হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল শরীফ বিশ্ব মুসলমানদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ এবং এ মাসে এ দিবসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অপরিসীম। ২৭ শে রমজান পবিত্র কুরআন অবতরনের দিন হিসেবে যেভাবে গোটা রমজান মাস সম্মানিত স্মরণীয় বরণীয়। তেমনিভাবে প্রিয় নবীর বেলাদত দিবস ১২ রবিউল আউয়াল মাসে হওয়ার কারণে গোটা মাস মুসলিম মিল্লাতের কাছে ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত এবং এ মাসের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ওলামায়ে ইসলামের সর্বসম্মতিক্রমে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
প্রতি বছরের মতো আজও সারা দেশে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হচ্ছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। আজ ২৬ আগস্ট বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ঈদে মিলাদুন্নবী। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করবে সরকার।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। এদিন সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন ও সশস্ত্র বাহিনীর সব স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক আইল্যান্ড, লাইটপোস্ট, স্থান ও সড়ক জাতীয় পতাকা, রঙিন পতাকা এবং ‘কালিমা তাইয়্যিবা’ লিখিত ব্যানারে সজ্জিত করা হবে।
বাংলাদেশ সচিবালয় মসজিদসহ দেশের সব মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে আলোচনাসভা ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার ও টক শো প্রচারের পাশাপাশি কিরাত, হামদ-নাত, স্বরচিত কবিতা পাঠসহ ছাত্রছাত্রীদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও আরবিতে খুতবা লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। স্মরণিকা বা ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ প্রান্তে মাসব্যাপী ইসলামিক বইমেলার আয়োজন করবে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়, ঢাকা ও জেদ্দা হজ অফিসসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও কর্ম, ইসলামের শান্তি, প্রগতি, সৌহার্দ্য, সহিষ্ণুতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানবাধিকার ও নারীর মর্যাদা বিষয়ক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, হামদ-নাত, স্বরচিত কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য হামদ-নাত, আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের সব সামরিক ও বেসামরিক হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার, শিশু সদন, আবাসিক শিশু বিকাশ কেন্দ্র ও প্রবীণ নিবাসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন করা হবে।
এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনসংক্রান্ত আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়।



