খুলনায় ‘এসপিএফ’ হ্যাচারির পোনায় ভাইরাস : খামারের পর খামার আক্রান্ত

শৈলমারি ও খলশিবুনিয়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে মরছে চিংড়ি
চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্ত খামারিরা
জীবানুযুক্ত পোনা সরবরাহের অভিযোগ দেশবাংলা ও ফিসটেক হ্যাচারির বিরুদ্ধে
এমএন জামান : প্রচলিত আছে ‘বটিয়াঘাটার মাটি, সোনার চেয়েও খাঁটি’। এ প্রবাদ বাক্যটি শোনা যায় খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার দক্ষিণ শৈলমারি ও খলশিবুনিয়া গ্রামের মৎস্য খামারিদের মুখে মুখে। নদী-খাল বেস্টিত এ জনপদের ২ শতাধিক খামারে সেমি ইনসেন্টিভ চিংড়ি চাষ-ই এখানকার মানুষের আয়ের একমাত্র উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় একের পর এক খামারে পোনাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মাছ মারা যাচ্ছে। গত ১ থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে অর্ধ কোটি টাকারও বেশি মাছ মারা গেছে। এতে করে খামারিরা চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে উল্লিখিত শ্লোগান অদূর ভবিষ্যতে আর চাষিরদের মুখে উচ্চারিত হবে কি-না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
মৎস্য খামারিদের অভিযোগ, এসপিএফ (স্পেসিফিক প্যাথজেন ফ্রি বা জীবাণুমুক্ত) প্রতিষ্ঠান হলেও খুলনার দেশবাংলা হ্যাচারি এবং ফিসটেক হ্যাচারি থেকে তাদেরকে জীবাণুযুক্ত পোনা সরবরাহ করা হয়েছে। যে কারণে খামারে পোনা ছাড়ার পর নির্দিষ্ট কয়েকদিন যেতে না যেতেই ‘হোয়াইট স্পট ডিজিজ’ এবং ‘আর্লি মটালিটি ডিজিজ’ (ইএমএস) নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে পোনাগুলো। তাদেরকে চোখের সামনেই একের পর এক পুকুরের মাছ মরে ছাপ হতে যাওয়া দেখতে হয়েছে। কিন্তু কোন প্রতিকার পাননি তারা। এজন্য সরকারের মাধ্যমে মৎস্য খামারিরা উল্লিখিত দুটি হ্যাচারিকে জবাবদিহির আওতায় এনে তাদেরকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় জীবাণুমুক্ত (এসপিএফ) পোনার নিশ্চয়তা এবং ক্ষতিপূরণ না পেলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের খামারিরা চিংড়ি চাষ করবেন কি-না তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ শৈলমারি ও খুলশিবুনিয়া গ্রামে সরজমিনে গেলে চাষিরা এ ভাবেই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্থানীয় চিংড়ি চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের একমাত্র পরিকল্পিত সেমি ইনসেন্টিভ চিংড়ি চাষ এলাকা খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বটিয়াঘাটা সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ শৈলমারী ও খলশিবুনিয়া গ্রাম। গ্রাম দু’টির প্রায় প্রতিটি পরিবারই চিংড়ি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এটিই তাদের আয়ের অন্যমত প্রধান উৎস্য। প্রতি বছরের মত এবারও এখানকার দুই শতাধিক সেমি ইনসেন্টিভ খামারে চিংড়ি চাষ শুরু করেন স্থানীয় খামারীরা। যথারীতি ‘দেশ বাংলা হ্যাচারি’ এবং ‘ফিসটেক’ নামক হ্যাচারি থেকে প্রতি হাজার পোনা দেড় হাজার টাকা দরে কিনে তাদের পুকুরগুলোতে (পন্ড) ছাড়া হয়। কিন্তু পোনাগুলো ‘হোয়াইট স্পট ডিজিজ’ এবং ‘আর্লি মটালিটি ডিজিজ’ নামক রোগে আক্রান্ত হয়। যার ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসের প্রথম দিক থেকেই চিংড়ি মারা যাওয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যেই মাছ মরে যাওয়ায় অর্ধ শতাধিক চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ধরণের ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ জন চিংড়ি চাষীর তথ্য এসেছে এ প্রতিবেদকের হাতে।
এর মধ্যে রাখি মৎস্য খামারের মালিক লিপটন মন্ডলের প্রায় ৯০ হাজার পোনা মারা গেছে। সুতনু এগ্রো ফার্মের মালিক সুতনু গাইনেরও চারটি পুকুরে প্রায় ৭০ হাজার পোনা মারা গেছে। এসব পোনা ক্রয় ক্রয় করা হয়েছিল দেশ বাংলা হ্যাচারি থেকে। একইভাবে শুভঙ্কর মন্ডলের লক্ষাধিক পোনা এবং কৃপা গাইনেরও লক্ষাধিক পোনা মারা যায়। এসব পোনা ফিসটেক হ্যাচারি থেকে ক্রয় করা হয়। খামারি কৃপা গাইন ফিসটেক হ্যাচারীর একজন ডিলার।
একইভাবে বিদ্যুৎ কবিরাজের ৭০ হাজার, অমরেশ মন্ডলের ২০ হাজার, লিটুর ২০ হাজার, অসীম গাইনের ২০ হাজার, বিপ্রদাস বৈরাগীর ৫০ হাজার, গৌতম হালদারের ৫০ হাজার, হরেন্দ্রনাথের ৪০ হাজার, সরকারি চাকরিজীবী বাসুদেব মন্ডলের লক্ষাধিক, প্রফুল্ল কুমার রায়ের চার লক্ষাধিক, মৃন্ময় গোলদারের ৪০ হাজার, দুলালের ৩০ হাজার, অতনু গাইনের ৬০ হাজার, অমল গাইনের ৫০ হাজার, মহানন্দ গাহিনীর ৫০ হাজার, রিপন ঢালীর ২০ হাজার, সুকান্ত গাইনের ৫০ হাজার, মানষ মন্ডলের এক লাখ, তাপস মন্ডলের এক লাখ, নারী চাষী বিপুলা রায়ের ১০ হাজার এবং দেবাশীষ মন্ডলের ৪০ হাজার পোনা মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক মৎস্য খামারি এবং চাষী রয়েছেন বলে জানা গেছে।
খামারি গৌতম গোলদার বলেন, তিনি ফিসটেক কোম্পানির পোনা ছেড়েছিলেন। ৪৭ দিনের মাথায় হোয়াইট স্পট রোগ ছড়িয়ে পড়ায় সব মাছ মারা যায়। এলাকার প্রায় সব ঘেরই একই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, তারা ঋণে জর্জরিত। সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানান তিনি।
অপর খামারি বিদ্যুৎ কবিরাজ বলেন, তাঁর পুকুরে দেশ বাংলা হ্যাচারীর ৭০ হাজার পোনা ছেড়েছিলেন। কিন্তু ৬৪ দিনের মাথায় হোয়াইট স্পট রোগে সব মাছ মারা যায়। এ বিষয়ে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি জানান।
নারী চাষী বিপুলা রায় বলেন, তিনি ১০ হাজার পোনা ছেড়েছিলেন। যা ৩৫ দিনের মধ্যে মারা যায়।
লিপটন মন্ডল বলেন, তাঁর রাখী মৎস্য খামারে দেশ বাংলা হ্য্চারীর ৬০ হাজার এবং ফিসটেক হ্যাচারীর ৩০ হাজার পোনা ছেড়েছিলেন। যা যথাক্রমে ৮২ ও ৪২ দিনের মাথায় সব মাছ মারা যায়।
বিপ্রদাশ বৈরাগী বলেন, তিনি প্রায় ৫০ হাজার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। কিন্তু ৪৭ দিনের মাথায় ‘হোয়াইট স্পট’ (সাদা দাগ) রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর সমস্ত মাছ মারা যায়। এ কারণে তিনি বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা না পেলে আগামী বছর হয়তো আর মাছ চাষ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
খামারী বাবলু মন্ডল বলেন, হ্যাচারির দুর্নীতি ও নি¤œমানের পোনার কারণে তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সরকারের কাছে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, গুণগত মানসম্পন্ন পিএল ও পোনা সরবরাহের জোর দাবি জানান তিনি।
এদিকে, এভাবে চিংড়ি মারা যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে মৎস্য খামারীদের অন্যতম সংগঠন ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব)। এ সংগঠনের পক্ষ থেকে সরজমিনে খামারগুলো পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হ্যাচারী কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
ফোয়াবের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহিন বলেন, বাংলাদেশে ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। তার মধ্যে একমাত্র পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ এলাকা বটিয়াঘাটার শৈলমারী ও খলশিবুনিয়া। ২০১২ সাল থেকে এখানে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ চাষাবাদের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান সৃস্টি হয়েছে। সারাদেশে যেখানে হেক্টর প্রতি ৩৫০ কেজি উৎপাদন হয়, সেখানে এই এলাকার চিংড়ি চাষীরা হেক্টর প্রতি ৮ হাজার-৯ হাজার কেজি চিংড়ি উৎপাদন করে নিজের কর্মসংস্থান, দেশের অর্থনীতি এবং বৈদেশিক অর্থনীতিতে দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্য তারা নিরলসভাবে দিন-রাত, ঝড়-বৃষ্টিতে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, এ এলাকায় প্রতিদিন পুকুরে তাদের মাছ মারা যাচ্ছে। দুইটা কোম্পানির নাম এখানে এসেছে- একটি হলো ফিসটেক, আর একটি হলো দেশ বাংলা হ্যাচারী। যারা বিগত সরকারের সুবিধাসুভোগী। তাদের এই সমস্ত ফার্মারদের প্যাথজেন ফ্রি পোনা দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা ন্যুনতম ভালো মাছ না দিয়ে খারাপ মানের পোনা দিয়ে আজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক চিংড়ি চাষীর ক্ষতি নির্ণয় করে কোম্পানি যেন তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়- সেজন্য তিনি মৎস্য অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ফোয়াব সভাপতি বলেন, সরকার ২শ’ কোটি টাকা ইতিমধ্যে চিংড়ি সেক্টরে দিয়েছে। কিন্তু চাষীরা সে টাকা পায়নি। আমরা দেখছি এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি। যেন এই সমস্ত চিংড়ি চাষী আগামী বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য ক্ষতিগ্রস্ত খামারীরা, তারা যেন উপকরণ সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ পায় এবং হতাশাগ্ৰস্ত হয়ে যেন চিংড়ি চাষ ছেড়ে না দেয়—সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
চিংড়ি পোনায় টুকটাক সমস্যা হতে পারে স্বীকার করে দেশ বাংলা হ্যাচারীর মালিক এমএ হাসান পান্না এ প্রতিবেদককে বলেন, এক মাস বয়সের মধ্যে পোনা মারা গেলে তার দায় হ্যাচারির। কিন্তু এসব পোনা দুই-তিন মাস পর মারা গেছে। এর দায় ফার্মারদের।
তার হ্যাচারিতে কোন ভাইরাস নেই দাবি করে তিনি বলেন, রোগমুক্ত হ্যাচারীর পোনা রোগমুক্ত খামারেই ব্যবহার করতে হবে। হ্যাচারি থেকে পোনা নেওয়ার পর তা ঘের বা পুকুরে ছাড়ার পর কোন কারনে রোগাক্রান্ত হলে সেজন্য হ্যাচারি কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। এজন্য এর ক্ষতিপূরণ হ্যাচারি কেন দেবে- পাল্টা সে প্রশ্নও করেন তিনি।
অভিযুক্ত অপর প্রতিষ্ঠান ফিসটেক হ্যাচারির মালিক তারেক সরকার বলেন, ঘের বা পুকুরের বায়োসিকিউরিটি মেইনটেন করতে না পারলে সমস্যা হবেই। তিনিও তার প্রতিষ্ঠানের পোনায় কোন সমস্যা হয়নি বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, পরিবেশগত সমস্যার কারণে পোনা মারা যেতে পারে। তবে এর কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তাদের প্রতিষ্ঠানের টিম সংশ্লিষ্ট এলাকা প্রদর্শন করবে। ফার্মারদের প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টিও চিন্তা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা আরো সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলেও জানান তিনি।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান শৈলমারি ও খলশিবুনিয়ায় চিংড়ি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের কাছ থেকে স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় ‘আইএইচএইচএনভি’ বা ইনফেকশাস হাইপোডার্মাল অ্যান্ড হেমাটোপয়েটিক নেক্রোসিস নামক ভাইরাস পাওয়া গেছে। তবে, ‘হোয়াইট স্পট ডিজিজ’ এবং ‘আর্লি মটালিটি ডিজিজ’ (ইএমএস) নামক রোগও দেখা গেছে। এ কারণে খামারীদের বিশেষ মিনারেল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মৎস্য অফিস খামারীদের সার্বিক পরামর্শ দিচ্ছে।
হ্যাচারী থেকে ভাইরাসযুক্ত পোনা সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, ভাইরাস হ্যাচারী থেকেও হতে পারে। আবার ফিড, পানি, কাঁকড়া, কুচিয়া, পাখি এবং মানুষসহ পরিবেশ থেকেও হতে পারে। এ কারণে এ ভাইরাস যে শুধুমাত্র হ্যাচারী থেকে আসছে- এটি বলা কঠিন। তবে, এর আগে গত বছর ল্যাবে পরীক্ষার পর দেশ বাংলা হ্যাচারীর পোনায় জীবানু সনাক্ত হওয়ায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ পোনা ডেস্ট্রয় (নস্ট) করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। যদিও এ তথ্য ‘ভূয়া’ বলে দাবি করেছেন হ্যাচারী কর্তৃপক্ষ।



