নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয় : আমাদের জন্যও সতর্কবার্তা

শান্ত প্রকৃতি মুহূর্তেই কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, গত বুধবার নেপালে সেটিই প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব। আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে চোখের নিমেষেই দেশটির রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৬শ’ ছাড়িয়েছে। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০টির বেশি দেশের অন্তত ৭০০ পর্যটক রয়েছেন। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের বেশ কিছু ভিডিও, স্থিরচিত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা গেছে, মানববসতি, রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ স্থাপনাসহ বড় বড় অবকাঠামো খড়কুটার মতো পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের ১১ বছর পর নেপালে আবার বড় বিপর্যয় দেখা গেল। প্রতিবেশী নেপালে এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতিতে আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। নেপাল এখন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার জন্য যেমন জরুরি সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে উদ্ধার তৎপরতাও জরুরি। জানা গেছে, নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপরতার পরিসর আরো বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় একই ধরনের হড়পা বান আঘাত হানতে পারে। এমন আশঙ্কায় তিব্বত-নেপাল সীমান্ত থেকে উদ্ধারকর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার প্রস্তাব দিলে নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিজেরাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। আমরা আশা করি, স্বল্প সময়ের মধ্যে নেপাল ঘুরে দাঁড়াবে। এদিকে ভয়াবহ এ ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পই বিপর্যয়ের মূল কারণ। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ভূমিকম্প নয়, বরং ভূমিধস থেকেই এমনটি হতে পারে। গুও ঝাউচেং নামের চীনের এক ভূতত্ত্ববিদের বরাত দিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবারের ঘটনা এত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে যে অনেকে টুঁ শব্দটি করার সুযোগ পায়নি। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০ মিটার বেগে ধেয়ে এসেছে এবং অতি দ্রুত ২০ কিলোমিটারের বেশি দূর পর্যন্ত এটি ছড়িয়ে পড়েছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে। তবে হিমবাহটি কেন ভেঙে পড়ল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যে কারণটি সামনে আসে তা হলো, পরিবেশ বিপর্যয়। তবে এ ঘটনায় বিজ্ঞানীরা দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয় অঞ্চলে বরফ গলার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০২৩ সালেই জাতিসংঘ জানিয়েছিল, উষ্ণায়নের কারণে ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ গলে গেছে। সেই সময় জাতিসংঘ বলেছিল, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালে গত এক দশকে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার, হিমালয় অঞ্চলে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই সতর্কবার্তা। বাংলাদেশও নানা সময় বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে। প্রকৃতির এই চরম সতর্কবার্তা অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। নেপালের এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।
