সম্পাদকীয়

অনলাইন সেবায় অব্যবস্থাপনা : পদক্ষেপ জরুরি

স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অনলাইনে সেবা প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া; একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়িয়ে স্মার্ট দেশ গড়ে তোলা। কিন্তু হতাশার কথা হলো, ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও এখনো এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না নাগরিকরা। দেখা গেছে, ডিজিটাল সেবার নামে অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ও ম্যানুয়াল দুই ব্যবস্থাই চালু রয়েছে। এতে নাগরিকদের বাড়তি সময় ও অর্থ দুটোই যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় স্থানীয় সরকার পর্যায়ের ই-গভর্ন্যান্সের এমন চিত্র উঠে এসেছে। গত সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ই-গভর্ন্যান্স অ্যাট দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস : কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক সংলাপে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় দেশের আট বিভাগের দুই হাজার ৬১১ জন নাগরিক এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল। গবেষণার তথ্য বলছে, নারীদের মাত্র ৩১.৯ শতাংশ এবং তরুণদের ১৭.৮ শতাংশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অনলাইনে সেবা নিতে পেরেছে। অন্যদিকে অনলাইনে আবেদন করার পরও ৫৪.৩ শতাংশ নারী ও ৪৭.৭ শতাংশ তরুণকে সরকারি দপ্তরে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয়েছে। অনলাইনে আবেদন করার পর প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী ও তরুণকে পরবর্তী ধাপে কাগজপত্র জমা দিতে সরকারি দপ্তরে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিককে ফি পরিশোধ বা স্বাক্ষরের মতো কাজের জন্য আবার অফলাইন প্রক্রিয়ায় ফিরতে হয়েছে। ফলে কী দাঁড়াচ্ছে? নামে অনলাইন আর কাজে অফলাইনে। গবেষণায় দেশের অঞ্চলভেদে অনলাইন সেবার মান তুলে ধরা হয়েছে। জানা গেছে, ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতিতে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রংপুর। প্রস্তুতি সূচকে ময়মনসিংহের স্কোর ৫৭.৩ হলেও রংপুরের মাত্র ৮.৮। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলের নারীরা ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতায় তুলনামূলক এগিয়ে। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে চিত্র বড়ই করুণ। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে যে বিষয়টি নিয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তা হলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। গবেষণায় দেখা গেছে, সেবা নিতে গিয়ে ৫৮ শতাংশ নারী নিজেদের অনিরাপদ বোধ করে এবং ৭৩.২ শতাংশ নারী তথ্য ফাঁস বা হ্যাক্ড হওয়ার আশঙ্কা করেন। আমাদের দেশে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। রয়েছে প্রশাসনিক কর্মকা-ে অদক্ষতাও। দেখা যায়, বড় পদে চাকরি করছেন কিন্তু অনলাইনে কাজকর্মের তেমন কিছুই জানেন না। এসব কারণে আমাদের এখানে অনলাইনে সেবা কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছায়নি। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন যথার্থই বলেছেন, ‘শুধু প্রযুক্তি যুক্ত করলেই কার্যকর ই-গভর্ন্যান্স হয় না। নাগরিকদের বারবার সরকারি অফিসে যেতে হলে সময় নষ্ট হয় এবং সেখানে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ থাকে।’ আমরা মনে করি, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইনে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চল অনলাইনে সেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে সেখানে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button