অসময়ে তিস্তার ভাঙন : জরুরি পদক্ষেপ নিন

উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি-অর্থনীতিÑসর্বোপরি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে তিস্তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তবে বাস্তবতা হলো, প্রায় প্রতি বর্ষায়ই এই নদী বয়ে নিয়ে আসে দুঃখ আর দুর্দশা। উজানের ঢল এবং অতিবৃষ্টিতে বন্যা ও নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে হাজারো মানুষ। এবারও তিস্তায় ভাঙন দেখা গেছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো, বর্ষা শেষে শরতেও তিস্তা নদীর ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ক্রস বাঁধের ৪০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে হঠাৎ করে বাঁধে এই ভাঙন দেখা দেয়। তিস্তাপারের মানুষের দুঃখের সীমা-পরিসীমা নেই। ভিটাবাড়ি একাধিকবার নদীগর্ভে চলে গেছেÑএমন মানুষের সংখ্যা অগণিত। সংগত কারণেই নদীভাঙন ওই এলাকার মানুষের কাছে ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এবারও স্থানীয় লোকজন আশঙ্কা করছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, বাঁধটি ভেঙে গেলে বড়দারগা, বুড়িরহাট, রামহরি, চতুরা, কালিরমেলা ও ডাংরারহাটÑএই ছয় গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। হুমকিতে পড়বে বসতভিটা, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং অন্তত পাঁচটি বাজার। পাউবোর তথ্য বলছে, তিস্তা নদীর কাউনিয়া স্টেশনে গত মঙ্গলবার সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ২৮.৭৩ মিটার এবং সকাল ৯টায় ২৮.৭৫ মিটার। ওই স্টেশনে তিস্তার বিপৎসীমা ২৯.৩১ মিটার। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুড়িরহাট ক্রস বাঁধে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেওয়ার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এলাকাবাসীর ভাষ্য, নদীতে অনেক স্রোত দেখা যাচ্ছে। গত বছরের মতো এবার ভাঙনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বুড়িরহাট এলাকার বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম জানান, শুকনা মৌসুমে এখানে বালু ছিল। একটি জায়গা অল্প দেবে গিয়েছিল, তখন কাজ করা হয়নি। এখন পানি বেড়েছে, বালু নেইÑকিভাবে ভাঙন সামলাবে? তিস্তা আন্ত সীমান্ত নদী হওয়ায় এর পানিপ্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সংগত কারণেই নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, তথ্য বিনিময় বাড়ানো এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত সমাধান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদিও হতাশার ব্যাপার হলো, নানা কারণেই বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকে ঝুলে রয়েছে। শুধু তিস্তা নয়, আমাদের নদী ব্যবস্থাপনায় বিবিধ দুর্বলতা রয়েছে। নদীমাতৃক দেশ হওয়ার পরও খরা মৌসুমে আমাদের কৃষিজমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে থাকে। সেচের জন্য পানি পাওয়া যায় না। একমাত্র উপায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ভরসা করা। শঙ্কার কথা হলো, সেই ভা-ারও দিন দিন কমে আসছে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেকের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এসব দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। কাজেই নদীভাঙনকে এখন শুধু বর্ষার ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, তিস্তায় ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং ও বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করতে হবে, যাতে নতুন করে জনপদ প্লাবিত না হয়। মনে রাখা দরকার, এসব সাময়িক পদক্ষেপ মাত্র, স্থায়ী সমাধান নয়। এ জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বর্ষায় ভাঙন রোধে দুই পারে শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ যেমন জরুরি, তেমনি নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করাও অপরিহার্য।
