সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের বড় সংকট : প্রত্যাবাসন জরুরি

সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর যেসব অপরাধমূলক তৎপরতার খবর আসছে তা অত্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার। অবৈধ অস্ত্র, মাদক চোরাচালান, খুনখারাবি থেকে শুরু করে ভয়াবহ সব কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর সদস্যরা ইয়াবা বেচে অস্ত্রের পাহাড় গড়ে তুলছে। দেখা যাচ্ছে, দিন দিন রোহিঙ্গাদের ঘিরে অপরাধের ডালপালা ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের আরাকান বা রাখাইনভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে অস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। গোষ্ঠীগুলো নিজ দলের সদস্য বাড়াতে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু করেছে। এ কারণে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র ও ইয়াবার বাজার কিছুদিন ধরে রমরমা। অস্ত্র সংগ্রহে অর্থের উৎস ইয়াবা। জানা গেছে, একটি গোষ্ঠীর কাছেই সাড়ে চার হাজার অস্ত্র রয়েছে। এ জন্য সীমান্তে ইয়াবার বাজার দখল নিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। তথ্য বলছে, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত দুই বছরে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ক্যাম্পে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে ২৯২ জন। সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর ছিল ২০২৩ সাল। ওই বছর দুই গোষ্ঠীর সংঘাতে নিহত হয় ৮৩ জন। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট উখিয়ার বালুখালী ৮ নম্বর ওয়েস্ট ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলিতে ছয় বছরের ইউসুফ নিহত হয়। সম্প্রতি কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ওপর থেকে ঘরের মতো দেখা গেলেও ভেতরে সুড়ঙ্গ। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে অপরাধীরা এসব সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে। অর্থৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র তৎপর রয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঠিক মূল্যায়নই করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট’। মিয়ানমারবিষয়ক জাপানের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে গত সোমবার সাক্ষাৎকালে এমন মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন, সেখানে তাদের পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে জাপানি দূতকে জানান প্রধানমন্ত্রী। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের হিসাবেই তা এখন দাঁড়িয়েছে ১২ লাখে। অন্যান্য হিসাবে এই সংখ্যা ১৫ লাখ। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সংকটই নয়, বরং এক বিরাট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া দুঃখজনক হলেও সত্য, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সহানুভূতি শুরুতে ছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া এই মানবিক বিপর্যয় বাংলাদেশের একার পক্ষে কাটানো সম্ভব নয়। আমরা মনে করি, এই সংকট বছরের পর বছর চলতে পারে না। দেখা গেছে, সময় যত গড়িয়েছে সংকট আরো জটিল হয়েছে। কাজেই এমন প্রেক্ষাপটে সামনে পথ একটাই, রোহিঙ্গাদের নিজভূমে প্রত্যাবাসন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button