জাতীয় সংবাদ

চীনে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে কর্মসংস্থান সংকট

# রোবট-এআইয়ের আধিপত্য #

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ চীনকে দীর্ঘদিন ধরে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিপুল শ্রমশক্তি, সস্তা উৎপাদন ব্যয় এবং রফতানিনির্ভর শিল্পের ওপর ভর করে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেই কারখানায় এখন আগের মতো শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে না। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবাসন খাতের মন্দা এবং উৎপাদন কার্যক্রমের পরিবর্তনের কারণে একদিকে চাকরি হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা, অন্যদিকে রেকর্ডসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করেও কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পূর্ব চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা দেশজুড়ে, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। চীনের অন্যতম বড় গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চ্যাংঝো শিংইউ অটোমোটিভ লাইটিং এ বছর ৪৪০ জন নতুন স্নাতককে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মধ্যে ১০৭ জনকে ছাঁটাই করা হয়। কোনওি আগাম সতর্কতা ছাড়াই তাদের সামনে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়, সামান্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়া, অথবা কারখানার উৎপাদন বিভাগে পাঠানো। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি ‘ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা ও সহানুভূতির ঘাটতি’র কথা স্বীকার করে এবং নিজেদের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। কিন্তু এর কয়েক দিন পরই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বছরের প্রথমার্ধে তাদের আয় প্রায় ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ইউয়ান লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমোদনও দেওয়া হয়। অর্থাৎ চাকরি হারানো তরুণ স্নাতকের হাতে গেল ক্ষতিপূরণের চেক, আর শেয়ারহোল্ডাররা পেলেন লভ্যাংশ। ঘটনাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমনীতি নিয়ে বিতর্ক ছিল না; অনেকের কাছে এটি দেশের বর্তমান চাকরির বাজারের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। রেকর্ডসংখ্যক স্নাতক, কিন্তু চাকরি কোথায়? একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা থেকে পুরো চীনের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। এ বছর চীনের কর্মবাজারে প্রবেশ করেছে রেকর্ড ১ কোটি ২৭ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকÑদেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্নাতক ব্যাচ। অন্যদিকে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার মে মাসে ছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে তাদের চেয়ে মাত্র কয়েক বছর বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের তুলনায় এই হার দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে লাখ লাখ তরুণ একের পর এক চাকরির আবেদন করছেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কোনও উত্তরই পাচ্ছেন না। সমস্যাটি শুধু নতুন স্নাতকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে শ্রমজীবী মানুষদের ওপর দাঁড়িয়ে চীনের শিল্প ও উৎপাদন অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তারাও এখন ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখে। অটোমেশনে কারখানায় কমছে শ্রমিকের প্রয়োজন ঃ চীনের নীল-কলার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে কারখানায় দ্রুত অটোমেশন চালু করা, অপেক্ষাকৃত কম শ্রম ব্যয়ের দেশগুলোতে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া এবং আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট। বিশেষ করে আবাসন খাতের ধস নির্মাণশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান কমিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের নির্মাণ খাত থেকে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক বেরিয়ে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে স্থায়ী চাকরির বিকল্প হিসেবে গিগ (চুক্তিভিত্তিক) অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। চলতি বছর চীনের গিগ কর্মীর সংখ্যা ৩২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ কোটি। অর্থাৎ নিয়মিত ও স্থায়ী চাকরি যে গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই গতিতে বিকল্প স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। গ্র্যাজুয়েট গ্লাট: শিক্ষিত বেকারের চাপ ঃ চীনের চাকরির সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। গত এক দশকে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তৈরি করেছে। কিন্তু স্নাতকদের সংখ্যা যে গতিতে বেড়েছে, সেই অনুপাতে বিশেষ করে অফিসভিত্তিক ও সাদা-কলারের চাকরি বাড়েনি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রবেশপর্যায়ের যেসব চাকরি একসময় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের কর্মজীবনের শুরুতে বড় ভূমিকা রাখত, সেগুলোর কিছু এখন এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর চাকরি পাওয়া তরুণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। পরিবর্তনের চেষ্টা করছে সরকার ঃ চীনের সরকার এই সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করছে এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। বেইজিং ইতোমধ্যে হাজার হাজার ‘অপ্রচলিত’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রাম বন্ধ বা পুনর্গঠন করেছে। এর মধ্যে মানবিক ও কিছু প্রচলিত বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ কমিয়ে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া নতুন স্নাতকদের জন্য ছয় মাসব্যাপী জাতীয় নিয়োগ কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছর এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ১ কোটি ২০ লাখ নগরভিত্তিক চাকরি তৈরির পরিকল্পনাও সামনে আনা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ দেশটির বিশাল কর্মসংস্থান সংকটের তুলনায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button