কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন

শিশু-কিশোররাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে থাকে সমৃদ্ধ দেশের চাবিকাঠি। আমাদের দেশের শিশু-কিশোররাও নানাভাবে আলো ছড়িয়ে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়Ñতাদেরই একটি অংশ সমাজে বিপথগামী হয়ে উঠছে। খুন, চাঁদাবাজি, মাদক, ছিনতাই থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই তাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এরাই কিশোর গ্যাংয়ের তকমা পেয়েছে। এরা বয়সে কিশোর হলেও সমাজে এদের অপরাধ খাটো করে দেখার সুযোগ কোথায়? কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা এখন বহুদূর পর্যস্ত বিস্তৃত। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের বাহক বা পেশাদার কিলিং মিশনেও এদের দেখা যায়। মাদক কারবারে তাদের অবাধ বিচরণ। খবরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকার একটি খুনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। দিনের বেলায় সেলুনের ভেতর প্রবেশ করে চাপাতি আর পিস্তল দিয়ে এক মাছ ব্যবসায়ীকে খুন করে তিন কিশোর। এটি গত মঙ্গলবারের ঘটনা। এর কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এমন ঘটনা একটি-দুটি নয়, অনেক। খবরে বলা হয়, বর্তমানে সমাজে অপরাধে যারা জড়িত, তারা বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। একই পাড়া ও মহল্লার বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা একজোট হয়ে কিশোর গ্যাং তৈরি করছে। কিশোর গ্যাং নিয়ে ২০২২ সালের শেষ দিকের একটি প্রতিবেদন বলছে, সেই সময় রাজধানীসহ সারা দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং তৎপর ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ছিল ৬৬টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি। বর্তমানে শুধু রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনের বিভিন্ন থানা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে। কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকা-ের পর কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। দেশজুড়ে আলোচিত এই নৃশংস খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়েছে। একজন ছাড়া বাকি তিনজনের বয়স ১৫ থেকে ১৬। এ ঘটনার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আমাদের ভাবা প্রয়োজন, কিশোর গ্যাংগুলো তৈরি হলো কেন? আর কেনই বা তারা এত ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে নানা অসংগতি রয়েছে। নানা কারণে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ব্যাহত হচ্ছে। রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবও। এসব মাধ্যম কিশোর বয়সেই এক ধরনের হিরোইজম ভাব তৈরি করে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক সময় বেপরোয় এসব কিশোরের ওপর পরিবারেরও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমাদেরও এ বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সরকারের দায়িত্ব হলো আইনের প্রয়োগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক করা এবং প্রতিটি অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজকেন্দ্রিক সেবা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, মানসিক সহায়তা, কর্মসংস্থান এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। আমরাও মনে করি, অপরাধ যে-ই করুক না কেন প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কেননা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে। এসবের পাশাপাশি সামাজে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার বিকাশ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
