সম্পাদকীয়

শিক্ষক নিয়োগ যুগোপযোগী নয় : আধুনিকায়ন প্রয়োজন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রত্যাশিত মান অর্জিত হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের রয়েছে নানামুখী সংকট। প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষকের যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব আরো বেশি। আবার অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের মানোন্নয়নে যেসব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, আমাদের এখানে সেগুলোও অনুপস্থিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারপর শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, অথচ আমাদের দেশে নিয়োগ দেওয়ার পর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। এতে প্রশিক্ষণ ছাড়াই বহু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজটি করেনÑবর্তমানে এমন শিক্ষকের সংখ্যা আড়াই লাখ। খবরে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে শিক্ষকরা মূলত চাকরি শুরুর আগে বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন), এমএড (মাস্টার অব এডুকেশন), সিএডের (সার্টিফিকেট অব এডুকেশন) মতো শিক্ষকতার ফাউন্ডেশনমূলক প্রশিক্ষণ পান না। তাঁরা চাকরি শুরুর পর এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এতে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪১ শতাংশ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নেই। এ ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষকদের অবস্থা আরো শোচনীয়। এমন বাস্তবতায় গতকাল পালিত হয়েছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬। ইউনেসকো এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো : পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছরের অঙ্গীকার’। খবরে বিভিন্ন দেশের শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি আলোচনা করা হয়। ফিনল্যান্ডে সাধারণত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষক শিক্ষা এবং গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ায় কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় শিক্ষক সনদ ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হয়। সিঙ্গাপুর, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিÑবেশির ভাগ দেশেই স্বীকৃত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক সনদ থাকার পর শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ভারতেও শিক্ষকতার জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ থাকতে হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী যথার্থই বলেছেন, ‘পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই, এমনকি ভারতেও আগে প্রশিক্ষণ, এরপর শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এই ব্যবস্থা চালু হলে প্রশিক্ষণ নিয়ে এত ভাবতে হবে না। প্রার্থীরা নিজ গরজেই প্রশিক্ষণ নেবেন। আর একসময় আমাদের শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য হয়েছে, ঘুষ-দুর্নীতি হয়েছে। সেই সময়ের শিক্ষকদের মান-দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এখন এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। ফলে আগের সেই অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন যাঁদের প্রশিক্ষণ নেই, তাঁদের প্রশিক্ষণ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।’ এ ছাড়া শিক্ষকদের বেতনকাঠামো নিয়েও রয়েছে বৈষম্য। খবরে বলা হয়েছে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা পান। অথচ সরকারি বেশির ভাগ চাকরিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমান চাওয়া হলে তাঁদের পদমর্যাদা সাধারণত থাকে দ্বিতীয় শ্রেণির। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন বঞ্চনাবোধ মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের পথে বড় অন্তরায়। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের রাজনৈতিকপ্রবণতাও পাঠদানের ক্ষেত্রে বাধা মনে করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সময় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদেরও একাংশ শিক্ষকের সঙ্গে সঠিক আচরণ করছে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা অহরহ ঘটেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা মনে করি, শিক্ষক হলেন সমাজের অভিভাবক। কাজেই সমাজে শিক্ষকের যথাযথ মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষকের বেতনকাঠামোসহ অন্যান্য দাবি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করবেÑএটাই কাম্য।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button