আন্তর্জাতিক

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিবদল

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রাশিয়ার তেল আমদানির জেরে নয়াদিল্লির ওপর চওড়া শুল্ক চাপিয়ে এতদিন যে কড়াকড়ি দেখিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন মুলুকেই এখন তার উল্টো চিত্র। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডিজেলের ঊর্ধ্বমুখী দামে বিপাকে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে শেষ পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা করে রাশিয়া থেকেই ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে বড় এক দ্বিমুখী নীতির প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে-নিজের দেশের ভোটারদের স্বস্তি দিতে ওয়াশিংটন যদি রাশিয়া থেকে জ্বালানি আনতে পারে, তবে ভারতের ক্ষেত্রে একই যুক্তির বেলায় কেন আপত্তি তোলা হবে? যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস ও দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদনে এই সমীকরণ উঠে এসেছে। কূটনীতি বনাম মার্কিন ভোক্তার স্বার্থ ঃ গত বছর ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের সামরিক শক্তি জোগাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। মার্কিন কৃষি খাত, পণ্য পরিবহন এবং শীতে ঘর গরম রাখার জন্য ডিজেল অত্যন্ত জরুরি একটি জ্বালানি। এর দাম বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়, যা আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় গত ৯ অক্টোবর পুতিনের সঙ্গে আলোচনা শেষে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের চুক্তি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম দফায় ৩ লাখ টন এবং নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে মস্কো। শোধনাগারের পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে এই পরিমাণ ৩০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যে প্রশাসন এতদিন মস্কোর যুদ্ধের অর্থায়নের ধুয়া তুলে রাশিয়ার তেল কেনার বিরোধিতা করেছে, তারাই এখন নিজেদের বাজার সামাল দিতে একই নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে আসছে। ঠিক একই ধরনের যুক্তি অতীতে ভারতও দিয়েছিল। ভারতের বক্তব্য ছিল, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাদ দিয়ে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের তীব্র আপত্তি ঃ তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ঘরের ভেতরেই প্রবল চাপের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গত ১১ অক্টোবর সুসান কলিন্স ও লিসা মারকাউস্কির মতো রিপাবলিকান সিনেটরদের পাশাপাশি জিন শাহিনের মতো ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারাও এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বন্ধে ভোটাভুটির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা আইনে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্কের সুযোগ থাকায় আইনি জটিলতাও কম নয়। যদিও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই সাময়িক ছাড় দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে রয়েছে। ভারতের জন্য কি কোনো ছাড় মিলবে? ঃ ওয়াশিংটনের এমন নীতিবদল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা হলেও ভারতের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ছাড়ের ঘোষণা এখনো আসেনি। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক স্টিফেন মুল দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ভারতের হাতেও জোরালো দর-কষাকষির সুযোগ রয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তা পরিশোধনের পর ডিজেল হিসেবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাজারেও যায়। ফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভারতও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বাড়াতে পারে। পরিশেষে বিশ্লেষকদের অভিমত, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন বাজারে জ্বালানির চাপ কমলে ট্রাম্প হয়তো আবারও কঠোর অবস্থানে ফিরে যেতে পারেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-নিজের দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে যে নীতিকে যৌ বলে ধরে নেওয়া হয়, অন্য দেশের কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে সেই একই বাস্তবতাকে মেনে নিতে মার্কিন প্রশাসন কতটা প্রস্তুত? তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button