জাতীয় সংবাদ

কক্সবাজারে আগুনে আনন্দ ভ্রমণ কেড়ে নিল ১০ তাজাপ্রাণ

# রিসোর্ট নয়, যেন মৃত্যুপুরী #
ম্যানেজার আটক, তদন্ত কমিটি গঠন
লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট

প্রবাহ রিপোর্ট : কক্সবাজারে একটি পর্যটন রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। ইনানী সমুদ্র সৈকতের কাছে পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে শনিবার সকালে এ অগ্নিকা- ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, সকাল ৭টা ২৫ মিনিটের দিকে তারা অগ্নিকা-ের খবর পান। সকাল ১১টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তিনি জানান, এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মারশেদ হোসেন বলেন, কাঠ দিয়ে তৈরি ৯ কক্ষের রিসোর্টটি আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা এবং আহতদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।
তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, ঢাকার বনশ্রী এলাকার ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহজাবিন আলভি (২৩), খিলগাঁও এলাকার লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফাইজান আহমেদ (৫)। এ ঘটনায় আহত ছয়জন হলেন, মুগধা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপরজন পড়ে গিয়ে আহত হন, তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দগ্ধ পাঁচজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিসোর্টটির ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন ঘোরাঘুরির জন্য রিসোর্টের বাইরে গিয়েছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান, নিহত অন্যদের পরিচয় ও ঠিকানা, আহতদের সংখ্যা, অগ্নিকা-ের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ম্যানেজার আটক : কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ওসি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনকে থানায় আটক রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটোয়ারটেক সৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি তিনতলা ভবনটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ছয় জন।
ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, উদ্ধার অভিযান চলাকালে রিসোর্টের সব কক্ষ তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি। হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত করতে অধিকতর উদ্ধার চালানো হয়।
অগ্নিকা-ের কারণ ও রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।
রিসোর্টে অগ্নিকা-ে তদন্ত কমিটি গঠন : জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সাংবাদিকদের তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য জানান। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এই অগ্নিকা-ে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, তদন্ত কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের প্রতিনিধিরা থাকবেন। অগ্নিকা-ের সূত্রপাত, আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান আরও জানান, অগ্নিকা-ে আহত তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানযোগে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ‘বিপজ্জনক বাগাড়ম্বর’ বলে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারত তার ‘আধিপত্যবাদী মানসিকতা’ বাদ না দিলে উপমহাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট : কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টটি অনুমোদন ছাড়াই চলছিল। রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সও ছিল না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
তিনি বলেন, গত জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করে নোটিশ করেছিল ফায়ার সার্ভিস। এরপরও রিসোর্টটির অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। আজ রিসোর্টটিতে আকস্মিক অগ্নিকা-ে ৬ জন নিহত ও ১০ জনের বেশি আহত হন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘শারদীয় দুর্গাপূজায় অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক’ প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক বলেন, তিনতলা কাঠের তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ। সেখানে খাবার তৈরি করা হতো। দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রিসোর্টটি ফায়ার সার্ভিসের তদারকির আওতায় প্রয়োজনীয় সনদ ছিল না।
তিনি জানান, সকালে সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থল থেকে নিকটতম ফায়ার স্টেশনের দূরত্ব ছিল ২২ কিলোমিটার। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। পরে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। এরইমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
রিসোর্টটির লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং সতর্ক করার পরও কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে রিসোর্টটি চালাচ্ছিল না।
কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা এবং অনুমোদনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডিজি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নোটিশের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
সামনে শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, এমন প্রশ্নে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, অনুমানের ভিত্তিতে আগুনের কারণ নির্ধারণ করা সঠিক হবে না। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই এ বিষয়ে জানা যাবে।
নোটিশ দেওয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চালু থাকা এবং সারা দেশে এ ধরনের রিসোর্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ফায়ার সার্ভিসের করণীয় পর্যালোচনা করা হবে। বিদ্যমান আইন ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুরান ঢাকায় ঘনঘন অগ্নিকা-, অনুমোদনহীন কারখানা ও গুদাম এবং বিস্ফোরক পদার্থের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সরু রাস্তা ও ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব না থাকা। এসব কারণে অগ্নিনির্বাপণকারী যানবাহন ও সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান ও বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা জরুরি। তবে পুরোনো বসতি ও স্থাপনাগুলোতে একসঙ্গে সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাস্তবিক অর্থেই কঠিন। এ জন্য সময় প্রয়োজন। নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে চলতে বারবার সচেতন করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু রাস্তার এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ধরনের তিন চাকার যান ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলে হোস পাইপ নিয়ে গিয়ে আশপাশের ভবনের পানির রিজার্ভারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে আগুন নেভানো যায় কি না, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button