নগরীর সন্ধানী ক্লিনিকে হামলা- ভাংচুর-গুলি বর্ষণ : গ্রেফতার ২

১৬ ঘন্টার ব্যবধানে আবারো হামলার চেষ্টা
স্টাফ রিপোর্টার : নগরীতে সন্ধানী ক্লিনিকে ব্যাপক ভাঙচুর ও গুলির ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ক্লিনিকের সোনাডাঙ্গা শাখায় সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। রোববার সোয়া ১টার দিকে তারা কর্তব্যরত চিকিৎসককে অস্ত্র প্রদর্শন করে হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর থেকে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এদিকে শনিবার রাতে বাবুখান রোড শাখায় হামলার পর থেকে ক্লিনিকের মূল ফটক বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। সেবা কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে তারা। এ ঘটনায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মামলা করতে রাজি না হওয়ায় রোববার এসআই সুদিপ্ত শাহীন বাদি হয়ে ৪জনের নাম উল্লেখ পূর্বক ১৫-২০জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় পুলিশ নগরীর শিববাড়ী এলাকার হিরা ও মারুফ নামে দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। তবে পুলিশ এ ঘটনার মূলহোতা ফাহিমকে না পেয়ে তার বাবাকে থানায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
রোববার সকালে খুলনা কমার্স কলেজের বিপরীতে সন্ধানী ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার প্রধান ফটক বন্ধ রেখে সামনে বসে রয়েছেন একজন প্রহরী। ভেতরে ভাঙচুর হওয়া দুই চিকিৎসকের চেম্বারের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাচ ও অন্যান্য জিনিসপত্র পরিষ্কার করছেন একজন কর্মী। সাধারণ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। এর মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন কেএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সেখানে কথা হয় সিটি স্ক্যান সহকর্মী মো. জাহিদের সঙ্গে। তিনি ঘটনার বিবরণ জানিয়ে বলেন, শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ক্লিনিকে ব্যাপক চাপ ছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগে কয়েকজন দুর্বৃত্ত ডা. কুতুব উদ্দিনসহ দুই চিকিৎসকের চেম্বারে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা ক্যাশ কাউন্টারে তা-ব চালিয়েছে। শনিবার রাতের পর থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত ডায়াগনস্টিকের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। তবে ক্লিনিকের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঘটনার পর থেকে এখানে মালিকপক্ষের কেউ আসেননি এবং চিকিৎসকরাও আসেননি।
আটক হিরা বলেন, ফাহিম নামের এক যুবক তাকে সন্ধানী ক্লিনিকের সামনে ডেকে নিয়ে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগে ক্লিনিকে হামলা শুরু হয়।
খুলনা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন রিপন বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে হিরা ও মারুফ নামে দুজনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে, হামলার কারণ সম্পর্কে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেনি। শুধু বলেছে- ‘বড় ভাই ফাহিম তাদেরকে ডেকে নিয়ে হামলা করায়। ’তবে হামলার ঘটনার মূল হোতা ফাহিমকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও পাঁচ থেকে সাতজনের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
খুলনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে। বাকিদের আটকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে থানায় মামলা দায়ের করার জন্য একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হলেও ভয়ে তাদের কেউ থানায় আসেনি।
এদিকে, রোববার দুপুর সোয়া ১টার দিকে সোনাডাঙ্গায় অবস্থিত সন্ধানী ক্লিনিকের দ্বিতীয় শাখায় সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তাদের অনেকের মুখে মাস্ক ছিল। এ সময় তারা হাসপাতালের ম্যানেজারকে না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। দুর্বৃত্তরা ক্লিনিকে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সেখান থেকে বের হয়ে যান। ওই সময় তারা কর্তব্যরত চিকিৎসক পার্থ রায়কে হুমকি দেয়। পরবর্তীতে ঘাড়ে হাত রেখে তাকে ভালো হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। আতঙ্ক সৃষ্টি করার পর দুর্বৃত্তরা ইজিবাইকে করে চলে যায়।
প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্লিনিকে থাকা এক নারী বলেন, ১২-১৩ জন দুর্বৃত্ত মুখে মাস্ক পরা অবস্থায় ক্লিনিকে প্রবেশ করে। তাদের বয়স আনুমানিক ১৮-১৯ বছর হবে। এদের মধ্যে একজনের হাতে একটি পিস্তল ছিল। তারা স্টাফদের লক্ষ্য করে গালিগালাজ করতে থাকে। উপস্থিত সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। স্টাফদের সঙ্গে তিনিও ক্লিনিক ত্যাগ করে বাইরে অবস্থান করেন। দুর্বৃত্তরা বের হওয়ার আগে কর্তব্যরত চিকিৎসকের চেম্বারে প্রবেশ করে।
ক্লিনিকে উপস্থিত চিকিৎসক পার্থ রায় বলেন, ১২-১৩ জন দুর্বৃত্ত আমার রুমে প্রবেশ করে। তারা আমাকে অস্ত্র প্রদর্শন করে হুমকি দেয়। ঘাড়ে হাত দেয় এবং ভালো হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তিনি দুর্বৃত্তদের বলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। এখানে চাকরি করি। কোনো লেনদেন থাকলে তা মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ করার পরামর্শ দেন তিনি। ক্লিনিকে তারা ১৫ মিনিট অবস্থান করার পর চলে যায়।
সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে চলে আসেন সোনাডাঙ্গা মডেল থানার এসআই সাইফুর রহমান। তিনি ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেন। অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি জানান। এ দুটি ঘটনার পর থেকে মালিকপক্ষের কেউ গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে আসেননি। এ বিষয়ে তারা কেউ কোনো কথা বলতেও চাচ্ছেন না।
প্রসঙ্গত, শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলে আসা ৭ থেকে ৮ জন দুর্বৃত্ত ক্লিনিকের সামনে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে। পরে, তারা ক্লিনিকের ভেতর ঢুকে অধ্যাপক ডা. কুতুব উদ্দিন মল্লিকের চেম্বার ও রিসিপশনে ভাঙচুর চালায়। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভাঙচুরের পেছনে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে ক্লিনিকের ম্যানেজার সন্ধানী ক্লিনিকের ম্যানেজার শেখ মহিদুল ইসলাম রাজু বলেন, আমাদের কাছে কেউ কোনো চাঁদা চায়নি। এর আগে কেউ তাদের কাছে চাঁদা দাবি করেনি। এ ছাড়া কোনো রোগীর চিকিৎসা নিয়ে জটিলতার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে যে কথা শোনা যাচ্ছে, সেটিও পুলিশ এখনো যাচাই করতে পারেনি।



