আমাদের সুন্দরবনে দস্যুতা : প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। বনের ঘনত্ব, বন্য প্রাণী ও সৌন্দর্যের দিক থেকে সুন্দরবনকে মনে করা হয় বাংলাদেশের ফুসফুস, কিন্তু সেই ফুসফুস নানাভাবে আক্রান্ত। বিবিধ প্রতিকূলতার মাঝে হারাতে বসেছে বনের নিজস্বতা। আট বছর আগে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও আজ পর্যন্ত সেই দস্যুতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বনজীবীরা সব সময় থাকছেন আতঙ্কে। সুন্দরবন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ঢাল। বাওয়ালি, মৎস্যজীবী ও মধু সংগ্রাহকরা বছরের পর বছর ধরে এই বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। একসময় বনদস্যুদের দাপটে এসব পেশাজীবীর জীবন ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো নির্মম ঘটনা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ছয়টি দস্যু বাহিনীর ৫৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ওই দিনই সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু হতাশার দিক হলো, আট বছর পরও নিরাপদ হয়নি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা। এখনো জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১১টি দস্যু বাহিনী। এসব বাহিনীতে শতাধিক সদস্য সক্রিয়। সম্প্রতি কোস্ট গার্ড ও এসআরবি-৬-এর ধারাবাহিক অভিযানে জিম্মি জেলেদের উদ্ধার, বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ এবং দস্যুদের আস্তানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দস্যু দমনে অভিযানও চলছে, অন্যদিকে দস্যুতাও চলছে। জানা গেছে, আত্মসমপর্ণকারী দস্যুদের অনেকের অভিযোগ, তাদের পুনর্বাসনে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আবার অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। সমাজও তাদের ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। এতে কেউ কেউ পুরনো কাজে ফিরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে দস্যুতা নির্মূল করা সম্ভব নয়। দস্যুদের আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসন, তাদের অপরাধে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি, দস্যুদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ, নতুন দস্যু বাহিনীর উত্থান ঠেকানো এবং অস্ত্র ও অর্থের উৎস শনাক্ত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বনজীবী, স্থানীয় জনগণ, বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামের দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য সক্রিয় দস্যু বাহিনী নির্মূল এবং সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা মনে করি, পেশাজীবীদের নিরাপত্তায় এ ধরনের অভিযান চালু রাখতে হবে। অভিযানের পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় সরকারকে আরো টেকসই ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটন যেন বনের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন না করে তোলে, সেই দিকটিও দেখা জরুরি।
