সম্পাদকীয়

পোশাক খাতে অস্থিরতা : শুধু একটি মহলকে দোষারোপ করেই দায়িত্ব শেষ নয়

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বিনিয়োগের বড় একটি অংশ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা-ভাঙচুর এবং অবরোধের মতো ঘটনায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়-অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ নভেম্বর তিন দিনে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএ-এর হিসাবে রপ্তানি মূল্য বাবদ ক্ষতি ৮৫৯ কোটি টাকা এবং বিকেএমইএ-এর হিসাবে নিট পোশাক খাতে উৎপাদন ক্ষতি প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এ বিপুল আর্থিক ক্ষতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় আশঙ্কার জায়গা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়া। দেশের কারখানাগুলোয় বারবার অস্থিরতা সৃষ্টি হলে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবেন, এটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদেশি ক্রেতা আগামী দুই মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর চিন্তা করছেন এবং বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিযোগী দেশগুলোয় স্থানান্তরের তথ্যও রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মনে রাখতে হবে, একটি ক্রয়াদেশ হারানো মানে শুধু একটি কারখানার ব্যবসা কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, ব্যাংকের ঋণ এবং অসংখ্য সহযোগী শিল্পের অস্তিত্ব। উৎপাদন বন্ধ থাকলে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করা যায় না। তখন বাড়তি ব্যয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়, নতুবা মূল্যছাড় কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অধিকার নিশ্চিত করা মালিক ও সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। একপক্ষ ষড়যন্ত্র করে শ্রমিকদের নামিয়েছে একথা বলেই মামলা হামলা করে দায়িত্ব শেষ করলে এ শিল্পকে বাঁচানো যাবে না। শ্রমিকদেরকে ও দেখতে হবে, এজন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও বুঝতে হবে, শিল্পের ক্ষতি করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। শিল্প টিকে থাকলেই কর্মসংস্থান ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকবে। কোনোভাবেই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কারণ, পোশাকশিল্পের ক্ষতি মানে শুধু একটি শিল্পের ক্ষতি নয়, তা দেশের অর্থনীতি ও কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button