রোহিঙ্গা গণহত্যার রায় ১৯ নভেম্বর

ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা বাংলাদেশের
প্রবাহ রিপোর্ট : রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের দায় নির্ধারণে আগামী ১৯ নভেম্বর রায় দেবেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতের শান্তি প্রাসাদে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় প্রকাশ্য অধিবেশনে রায় পড়বেন আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি ইউজি ইওয়াসাওয়া। এই রায়ে প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করতে পারে আদালত। এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবার আদালত রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়েছে। এই রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হবে। এর বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে চলমান অন্য মামলাগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দক্ষিণ আফ্রিকার করা ইসরাইলবিরোধী মামলা। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে দেশটি। সেখানে নিশ্চিতভাবে নিহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে।
২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। এতে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকা-, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি।
মিয়ানমার গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসার হামলার জবাব দিতেই সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। ২০১৭ সালের আগস্টে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় আরসার হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হয়েছিলেন বলে দাবি করে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহতাও মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের হয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা তদন্ত করেছিলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টোনিয়া মুলভি। তিনি মিডল ইস্ট আইয়ের ‘এক্সপার্ট উইটনেস’ পডকাস্টকে বলেন, গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে গাম্বিয়ার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে যৌন সহিংসতার ঘটনা।
মুলভির ভাষ্য অনুযায়ী, এক নারী তাকে বলেছিলেন, ‘আমি ভাগ্যবতী ছিলাম, আমাকে মাত্র তিনজন ধর্ষণ করেছে।’
তিনি জানান, সেনারা নারী ও কিশোরীদের পরিবারের সদস্য, এমনকি সন্তানদের সামনেই প্রকাশ্যে ধর্ষণ করত। জনসমাগমস্থলেও এসব ঘটনা ঘটানো হতো। কোনো কোনো ঘটনায় একসঙ্গে ৪০ জন পর্যন্ত নারী ও কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড এই মামলায় রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।
গাম্বিয়ার অভিযোগ, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমার। তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়।
সেই সময় মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেনাবাহিনী কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। সেনাবাহিনীর তৈরি সংবিধানের কারণে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সু চির সরকারকে উৎখাত করেন মিন অং হ্লাইং। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন। পরে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট আইনপ্রণেতাদের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। জান্তা সরকারের আয়োজন করা নির্বাচনের পর এই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে।
২০১৭ সালের অভিযানের সময় রোহিঙ্গারা গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার শিকার হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওই অভিযানকে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নির্মূল অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
তবে আইসিজেতে মামলাটি কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়। এটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ। ফলে আদালত নির্ধারণ করবেন, গণহত্যার জন্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার দায়ী কি না। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা এই মামলার বিষয় নয়।
মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী করা হলে মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়তে পারে। তার প্রেসিডেন্ট হওয়াকে আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা : ২০১৮ সালে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশন জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করার মতো যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। এ জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত ও বিচার করার সুপারিশ করে সংস্থাটি।
এর পরের বছর, ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থন ছিল এই উদ্যোগের পেছনে। কোনো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও একটি রাষ্ট্রের গণহত্যার অভিযোগে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘটনা ছিল এটি।
গাম্বিয়ার যুক্তি ছিল, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্রেরই এই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। তাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার তাদের রয়েছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে অন্তর্র্বতী আদেশ দেন। আদালত বলেন, গণহত্যা সনদের আওতায় রোহিঙ্গাদের অধিকার অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাস্তব ও আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে মিয়ানমারকে গণহত্যামূলক কর্মকা- প্রতিরোধ এবং এ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে মামলাটি শুনানির এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ করে দেন আদালত। এরপর ২০২৬ সালের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি মামলার মূল বিষয়ের ওপর শুনানি হয়। এতে রোহিঙ্গা সাক্ষীদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে জবানবন্দি নেওয়া হয়।
মামলায় গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের বাইরে আরো ১১টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, কানাডা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া ও যুক্তরাজ্য।
ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সহকারী অধ্যাপক এবং আইসিজের সাবেক সহযোগী আইন কর্মকর্তা মাইক বেকার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, তৃতীয় পক্ষের এতগুলো রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে এই প্রথম কোনো মামলার মূল বিষয়ে রায় দিতে যাচ্ছে আদালত।
তার মতে, গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমারের মতো মামলাগুলো সমসাময়িক বিশ্বে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা ও কার্যক্রমের পরিধি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই মামলার ফলাফল নির্ধারণ করবে, সেই প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে কি না।



