সম্পাদকীয়

দেশ মাদকে ভাসছে : ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

একদিকে সারা দেশেই মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানও চলছে। এসব অভিযানে গ্রেপ্তারের তালিকাও ছোট নয়Ñএই গোটা চক্রের মধ্যে একটি প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায় তা হলো, মাদক কারবারে জড়িত মূল হোতা বা গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় কেন? সারা দেশে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ২৫ হাজার ৫৫০ জনের বেশি শীর্ষ কারবারি। আবার তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে এক হাজারের বেশি গডফাদার। অভিযোগ রয়েছে, এসব হোতার মধ্যে কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও থানাহাজত থেকে ফিরে এসে আবারও একই কাজ করে। অভিযানে যেসব মাদক জব্দ করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ মাদক ক্রেতাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইয়াবার ক্ষেত্রে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ধরা পড়ে, বাকি ৮৫ শতাংশই অধরা। এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সারা দেশে অনুসন্ধান চালিয়েছে। গত তিন মাসের অনুসন্ধানে নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এতে জানা যায়, কক্সবাজার ও টেকনাফ কেন্দ্রিক মাদক কারবারি সবচেয়ে বেশি। অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন গডফাদারের নামও উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে কারো কারো আস্তানা মিয়ানমারের আরাকানে। টেকনাফ-কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে দেদার ইয়াবা ঢুকছেÑএই খবর নতুন নয়, বরং কয়েক বছর থেকেই এই খবর চাউর হয়েছে। সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এলাকাটি বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু এতে কি মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে? মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, আসেনি। রাজধানীর মতো বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইয়াবা, হেরোইন, কুশের মতো ভয়াবহ মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময় খবরে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে মাদক। সন্ধ্যা হলে কোথাও কোথাও ডেকে ডেকে চলে মাদক বিক্রি। এখানেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আসে। পর্যবেক্ষকমহল মনে করছে, দিন দিন মাদক নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ তৎপরতায় সীমিত থাকছে না, বরং ক্রমেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এমন অভিযোগে কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাদক নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি। মাদকের ভয়াবহ ক্ষতির দিকগুলো সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। মাদকাসক্ত লোক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যেকোনো ভয়াবহ কা- ঘটাতে পারে। সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদকাসক্ত ছেলের বিরুদ্ধে বাবাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এমন আরো বহু নজির পাওয়া যাবে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাইয়ের ঘটনা তো নিত্যদিনের চিত্র। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ এই মারণনেশায় বুঁদ হয়ে আছে, যা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বড় অন্তরায়। আমরা মনে করি, দেশে মাদকের বিস্তার রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের বিকল্প নেই। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদকের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সীমান্তগুলো কড়া নজরদারির আওতায় আনতে হবে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি রোধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সর্বোপরি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button