সম্পাদকীয়

মাঝি-মৌয়ালদের জরুরি সহায়তা দিন

# সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা #

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় ১ জুন থেকে টানা তিন মাস মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত বন বিভাগ গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োচিত, বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশগতভাবে অপরিহার্য। জুন থেকে আগস্টÑএই ত্রৈমাসিক সময়কাল সুন্দরবনের জীবনের অন্তর্লীন সৃষ্টিক্ষণের সময়। নদী-খাল হয়ে ওঠে মাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ আশ্রয়স্থল; বনভূমি পরিণত হয় উদ্ভিদের নবজন্মের ক্ষেত্রে; পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রবেশ করে তাদের প্রজননের সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল পর্যায়ে। এই সময়ে মানুষের উপস্থিতি, যান্ত্রিক শব্দ, আহরণ কার্যক্রমÑসবই প্রকৃতির এই অন্তর্গত সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। অতএব, বনকে মানুষের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক মৌলিক নৈতিক অঙ্গীকার। তবে এই নৈতিকতার আরেকটি মুখও আছে। সেটি মানবিকতার মুখ। সুন্দরবন কেবল জীববৈচিত্র্েযর আধার নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারী, মাঝিÑএই বিপুল জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বননির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। তিন মাসের প্রবেশনিষেধাজ্ঞা তাঁদের জন্য কেবল কর্মবিরতি নয়; এটি আয়হীনতা, ঋণগ্রস্ততা ও অস্তিত্বসংকটের সমার্থক হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে আমরা কি মানুষের জীবনযাত্রাকে উপেক্ষা করতে পারি? রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়; বরং উভয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। বাস্তবতা হলো, এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর কোনো বিকল্প জীবিকা বা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়। এটি নীতিগত এক গুরুতর ঘাটতি। উল্লেখ্য যে সাগরে মাছ ধরার ওপর মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা জারির সময় সরকার জেলেদের জন্য খাদ্যসহায়তা ও নগদ প্রণোদনার ব্যবস্থা করে থাকে। এই নীতি কেবল সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক সুরক্ষাকাঠামোর অংশ। অথচ সুন্দরবনের ক্ষেত্রে একই ধরনের উদ্যোগের অনুপস্থিতি বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক। সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর জীবন রক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রেরই। অতএব, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার সময়কালীন তিন মাসের জন্য বনজীবীদের খাদ্যসহায়তা, নগদ ভাতা, বিকল্প কর্মসংস্থান কিংবা ক্ষুদ্রঋণ পুনঃ তফসিলীকরণের মতো পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও বিকল্প আয়ের পথ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়; এটি সহাবস্থানের। সুন্দরবনের নীরবতা যদি জীবনের পুনর্জন্ম নিশ্চিত করে, তবে সেই নীরবতার মূল্য যেন মানবজীবনের আর্তনাদে পরিণত না হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক দায়িত্বÑএই দুইয়ের মধ্যে সুষম সমন্বয়ই হতে পারে টেকসই নীতিনির্ধারণের একমাত্র পথ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button