সম্পাদকীয়

মামলার দ্রুত তদন্তের বাধাগুলো দূর করা জরুরি

‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’-আইন অঙ্গনের এই চিরায়ত প্রবাদটি বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে এক রূঢ় বাস্তবতা হিসাবে বারবার সামনে আসছে। বিলম্বিত বিচার যে কার্যত বিচারহীনতারই শামিল, তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার দ্রুত রায় এ কথা প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বিচার বিভাগ আন্তরিক হলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় দ্রুততম সময়ে বিচার সুনিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু এই ইতিবাচক দৃষ্টান্তের বিপরীতে দেশের অধিকাংশ ধর্ষণ মামলাই আলোর মুখ দেখছে না শুধু তদন্তের ধীরগতির কারণে। আর এই ধীরগতির অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা। বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, ধর্ষণ মামলার তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তাদের ৩০ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্টের অপেক্ষায় অধিকাংশ মামলার তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। মঙ্গলবার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেতে ১২ মাসেরও বেশি পার হয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে তদন্ত মাসের পর মাস ঝুলে থাকছে, যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের জামিন পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ল্যাবরেটরিতে অতিরিক্ত মামলার চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং তীব্র লোকবল সংকটের কারণেই মূলত এ দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ধর্ষণ মামলায় অকাট্য প্রমাণ হিসাবে ডিএনএ পরীক্ষার চাহিদা বহুগুণ বাড়লেও সেই তুলনায় ল্যাবের সংখ্যা এবং দক্ষ জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। আইন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের এই সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এ অচলাবস্থা নিরসনে স্বাভাবিকভাবেই একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দেশে ফরেনসিক ও ডিএনএ ল্যাবরেটরির সংখ্যা যেমন দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে, তেমনই জরুরি ভিত্তিতে দক্ষ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষণ মামলার বিচারে মেডিকেল বা ডিএনএ রিপোর্টের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না হয়ে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, ভুক্তভোগীর শরীরের আঘাতের চিহ্ন এবং ডিজিটাল অ্যাভিডেন্সকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিচারিক মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। সরকার কাঠামোগত সংকটগুলো দূর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button