সম্পাদকীয়

জ্বালানিসংকট কাটাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন

এটি অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া খবর যে চলমান জ্বালানিসংকট থেকে উত্তরণে সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন সংকটের মুখে না পড়তে হয় সেই লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানিসংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। খবরে বলা হয়, সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছেÑদেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্স শক্তিশালীকরণ, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি), বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ। এ প্রসঙ্গে সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান সাতটি কূপ খনন শেষ হলে আরো ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্যও পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজও চলমান। কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরো ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। এখানেই শেষ নয়, এসবের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্যগুলো; যেমনÑসোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপীয় সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং ২ শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর থেকে শর্ত সাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করেছে। এদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে দেশের শিল্প খাত দীর্ঘদিন থেকেই ধুঁকছে। গত বুধবার এই খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বঙ্গভবনে যান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। সেখানে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা জানান, জ্বালানিসংকটের কারণে বেশির ভাগ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চলতি বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি, আর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে আক্রমণ করে। অর্থাৎ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিন পর থেকেই শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বেই জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসংকট তীব্র হয়, যার ধাক্কা লাগে বাংলাদেশেও। তার পরও সংকটের তীব্রতা আঁচ করতে পেরে সরকার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, জ্বালানিসংকট থেকে উত্তরণে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button