এত নৃশংসতা কেন : শিশুর বাসযোগ্য সমাজ চাই

কয়েক দিন পর পর শিশুর প্রতি নৃশংসতার যেসব ঘটনা আমাদের সামনে আসে, তাতে সমাজের যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষের বাকশক্তি হারানোর উপক্রম হয়। সর্বশেষ কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকা- গোটা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করেছে। ফুটফুটে ছেলেটি বাসা থেকে বের হয়ে গেল, এরপর নিখোঁজ…সব শেষে মিলল রক্তাক্ত মরদেহ। এমন মর্মান্তিক ঘটনা কিছুতেই মানা যায় না। একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় অপ্রতিমের মা-বাবা। আমরা এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করছি এবং বর্বরোচিত এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানাই। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। এরপর নিখোঁজ ছেলের সন্ধান চেয়ে ফেসবুকে ছবিসহ স্ট্যাটাস দেন মা নাহিদা বেগম। মায়ের আকুতিভরা স্ট্যাটাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। থানায় জিডিও করা হয়। পাশাপাশি অপ্রতিমের সন্ধান চায় ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন)। এই জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের উদ্ধারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। গত শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরে প্রথম আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চলতি বছর প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে, আর উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু। অর্থাৎ এখনো নিখোঁজ রয়েছে দুই হাজার ৩৮ শিশু। এই নিখোঁজ শিশুরা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে? সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে, এই সমাজ শিশুদের বাসযোগ্য হবে কবে। গতকালই আরেক খবরে দেখা যায়, সামান্য ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে খুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন আযমকে হত্যা করেছে তারই মেসমেটরা। মাত্র ১০ দিন আগে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। আর এখনই তার এই নির্মম পরিণতি। এমন তুচ্ছ কারণে বর্বরোচিত ঘটনা এখন প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, যা কখনোই সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই পরিস্থিতি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিও সামনে আনে। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, যেসব ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় হয় শুধু সেসব ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর তোড়জোড় দেখা যায়। অল্প সময়ের মধ্যে বিচারের নজিরও রয়েছে। কিন্তু বহু ঘটনা আমাদের জানার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল জানান, ১২ ঘণ্টার মধ্যে চার আসামির সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা অপরাধও স্বীকার করেছে। আমরা চাই, অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। একই সঙ্গে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূলে নিরাপত্তা বাহিনীর আরো সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
