জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি : খাদ্য নিরাপত্তায় নজর বৃদ্ধি জরুরি

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে এর প্রথম আঘাতটি এসে পড়ে দেশের প্রান্তিক কৃষকের ওপর। সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করায় দেশের মাঠপর্যায়ের কৃষকদের কপালে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ধান মাড়াই এবং উৎপাদিত ফসল বাজারে পরিবহণ-কৃষির প্রতিটি ধাপেই এখন বাড়তি খরচের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচপাম্প, পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ করছেন কৃষকরা। একদিকে সার, বীজ ও কীটনাশকের আকাশচুম্বী দাম, তার ওপর সেচ ও পরিবহণে জ্বালানির অস্বাভাবিক খরচ বৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন খরচকে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছে। আসছে বোরো মৌসুমে-যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ জোগান দেয়-সেখানে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় সেচের ওপর। ডিজেলের এই চড়া দাম বজায় থাকলে অনেক কৃষকই হয়তো আবাদ সংকুচিত করতে বাধ্য হবেন, যা চূড়ান্ত বিচারে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। তদুপরি, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে কৃষকরা প্রায়শই তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। একদিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কা-এই দ্বিমুখী সংকটে পড়ে কৃষকের জীবনজীবিকা যে অনিশ্চয়তায়, তা বলাই বাহুল্য। এই সংকট থেকে কৃষককে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত ডিজেলে বিশেষ প্রণোদনা বা সরাসরি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে সরে এসে সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিড বিদ্যুতের সংযোগ সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছে, সেই অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিতে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে-এই সত্যটি অনুধাবন করে কৃষি খাতকে রক্ষায় সরকারের দ্রুত ও আন্তরিক পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।
