সম্পাদকীয়

দখলে-দূষণে বিপন্ন নদী : চাই সমন্বিত উদ্যোগ

দেশের বেশির ভাগ নদী যে অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে, তা নতুন কিছু নয়। নদীমাতৃক এই দেশের বহু নদীই বছরের পর বছর ধরে নাব্যতা সংকটে ভুগছে। কত শত নদী মানচিত্র থেকেই উধাও হয়ে গেছে, তার হিসাব নেই। শহরাঞ্চলের আশপাশে যেসব নদী এখনো বয়ে চলছে সেগুলো দখল-দূষণে একাকার অবস্থা। যদিও নদী রক্ষায় নানা সময় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোও ফলপ্রসূ হয়নি। দখল-দূষণ থেমে থাকেনি। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল পালিত হয়েছে বিশ্ব নদী দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলোÑ ‘নো ফরেস্টস, নো রিভারস, নো ওয়াটার, নো লাইফ’Ñ অর্থাৎ বনভূমি, নদ-নদী, পানি না থাকলে জীবনের অস্তিত্বও থাকবে না; যা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক তো বটেই, এক ধরনের সতর্কবার্তাও। জানা যায়, রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো বাঁচাতে দুই যুগের বেশি সময় ধরে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নদী রক্ষায় দখল উচ্ছেদ, ড্রেজিং, তীর রক্ষা, ট্যানারি স্থানান্তর, সৌন্দর্যবর্ধনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্তি কী? খবরে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনমুখ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীতে পড়ছে। অথচ দূষণ বন্ধে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু নদীতে বর্জ্য পড়া তো বন্ধ হয়নি, নতুন নতুন দূষণমূলের সন্ধান পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নদীদূষণের কারণ আমাদের কারো অজানা নয়। বিআইডাব্লিউটিএর জরিপে দেখা গেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোও এই দূষণে জড়িত। ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন বুড়িগঙ্গায় ৫৭টি ও তুরাগে ৯টি স্থানে বর্জ্য ফেলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি ড্রেনের মধ্যে ১৯টি বুড়িগঙ্গায় এবং দুটি শীতলক্ষ্যায় যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টির একটি বুড়িগঙ্গায় এবং ১৫টি তুরাগে গিয়ে পড়েছে। এর ফলাফল হিসেবে বুড়িগঙ্গা ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’, তুরাগ ‘সংকটাপন্ন’ এবং ধলেশ্বরী ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ তকমা পেয়েছে। আশার কথা হলো, নতুন সরকার আসার পর নদীদূষণ বন্ধে বর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। নদী কমিশন সূত্র বলছে, ঢাকার চারপাশের নদী দখল ও দূষণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নদীর তীর ও আশপাশের সব দূষণমুখ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বন্ধ করা হবে। আমরা এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন চাই। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, ‘নদী রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। শুধু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে নদী রক্ষা সম্ভব নয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় দরকার। সমন্বয়ের মাধ্যমে আমাদের নদীগুলো বাঁচাতে হবে।’ আমরা মনে করি, নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ কাজে দেবে না। তাই দেশের নদী রক্ষায় শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার পর পুনরায় দূষণ-দখলও ঠেকাতে হবে। এই কাজে জনসাধারণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, নদী বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button