আর্থিক চাপে সাধারণ মানুষ : চাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

বাজারে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে না। জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয়বৃদ্ধির কারণে বেশির ভাগ মানুষ এখন দিশাহারা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের বহু মানুষকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে বাড়ছে ভোক্তাঋণ। অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের চাহিদা কমেছে। উদ্বেগের কথা হলো, এভাবে চলতে থাকলে সমাজের এক অংশের মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং ঋণ শোধের সক্ষমতাও কমে আসবে, যা গোটা অর্থনীতির জন্যই অশনিসংকেত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে ভিত্তিতে জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনÑএই তিন মাসে দেশে ভোক্তাঋণ বেড়েছে পাঁচ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। জুন শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ ৫০ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এরপর চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে হয় এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। জুন শেষে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন এই পর্যন্ত ৯ মাসে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক পরিবার বিলাসী খরচের জন্য নয়; বরং জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় মেটাতেই ব্যাংকঋণের দ্বারস্থ হচ্ছেন। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো অপরিহার্য খাতে খরচ মেটাতেই মানুষ ঋণ নিচ্ছে। কথা হলো, এই ঋণ একজনকে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সহায়তা করছে ঠিকই, কিন্তু তার আয় বৃদ্ধিতে কি কোনো ভূমিকা রাখছে? তা যদি না হয়, তাহলে সামনের দিনে ওই পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা বাড়বে, একই সঙ্গে আরো ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভালো কিছু বয়ে আনবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বেড়েছে, কিন্তু একইভাবে শিল্প খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। বিশেষ করে জ্বালানি অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় দেশে বেকার সংখ্যা বাড়ছে। খবরে বলা হয়েছে, শিল্প খাতে ঋণের প্রবাহ খুবই কম। মার্চ শেষে শিল্প খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল সাত লাখ ৯৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে সাত লাখ ৯৫ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৫৫২ কোটি টাকা। পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, ‘শিল্প খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়’। শিল্পের পাশাপাশি নির্মাণ ও পরিবহন খাতের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অস্থিরতা আরো বেড়েছে। আমরা মনে করি, চলমান সংকট কাটাতে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফিরিয়ে আনাই অন্যতম কাজ। এ জন্য বেসকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারকে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশি বিনিয়োগ বাড়লে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আকৃষ্ট হবে। এর পাশাপাশি বাজারে নৈরাজ্য রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
