সম্পাদকীয়

বিদেশগামী অধিকাংশ কর্মীই অদক্ষ : প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন

প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশের মায়ামমতা, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে বিদেশে যান, অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশই অদক্ষ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্রই বটে। অদক্ষতার কারণে আমাদের কর্মীরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত ও নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। অভিবাসী কর্মীদের সাধারণত পেশাজীবী, দক্ষ, আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষÑএই চার ভাগে দেখা হয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, শিক্ষক, হিসাবরক্ষক, কম্পিউটার অপারেটর, ফার্মাসিস্ট ও নার্সদের মতো পেশাকে পেশাজীবী হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া মেকানিক, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, রংমিস্ত্রি, পাচক, ড্রাইভার, প্লাম্বার, গার্মেন্ট শ্রমিক ও সনদপ্রাপ্ত কেয়ারগিভাররা দক্ষ কর্মী। অন্যদিকে কৃষক, মালি ও বিভিন্ন সহায়ক কাজের কর্মীরা আধাদক্ষ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহকর্মীসহ কিছু পেশা স্বল্প দক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর বাংলাদেশের অভিবাসন মূলত আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমবাজারনির্ভর। জানা গেছে, ২০২৫ সালে মাত্র ৩-৪ শতাংশ পেশাজীবী, ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ এবং ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ আধাদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ কর্মী বিদেশে গেছেন। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশে সরকারি টিটিসি বা বেসরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্রÑকোনো জায়গা থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। আরো যে হতাশার কথা হলো, শুধু প্রশিক্ষিত কর্মীর হার কম নয়, প্রশিক্ষণ প্রদানের সক্ষমতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। খবরে বলা হয়, ৪০টি টিটিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৭৩টি অনুমোদিত পদ থাকলেও প্রায় ৩৬টি পদই শূন্য। এর মধ্যে প্রশিক্ষকের অনুমোদিত পদের গড়ে ২১টি শূন্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে থাকার আরেকটি উদাহরণ হলোÑকোন কর্মী কোন দেশে গেলেন, কোন পেশায় গেলেন, সেখানে গিয়ে একই পেশায় আছেন কি না, কর্মস্থল পরিবর্তন করলেন কি না এবং দেশে ফিরে এলে তাঁর কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজনÑএসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যায় না। মনে রাখা প্রয়োজন, সময় বদলেছে, বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রতিদিন নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে, আমাদেরও সেভাবে তৈরি হতে হবে। অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর যথার্থই বলেছেন; বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্য কত লাখ কর্মী বিদেশে গেলেন, এই সংখ্যায় মাপা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বদলে যাওয়ায় এখন শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার সুযোগ কমছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য দেশভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী কারিকুলাম ও যন্ত্রপাতি উন্নয়ন, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো, দক্ষতার মানসম্মত সনদ চালু এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল ডেটা বেইস তৈরি করা সময়ের দাবি। দক্ষতার পাশাপাশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দিকেও মনযোগ দেওয়া দরকার। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৭৫টি দেশে কর্মী গেলেও মোট কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশ মাত্র সাতটি দেশে যায়। এর মধ্যে পাঁচটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এবং দুটি মালয়েশিয়াসহ প্রধান কয়েকটি শ্রমবাজার রয়েছে। আমরা মনে করি, সময়ের চাহিদা মেটাতে দক্ষ কর্মী তৈরির বিকল্প নেই। পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদেশগামী কর্মীদের গন্তব্য দেশের ভাষার ওপরও প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এটাই কাম্য।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button