সম্পাদকীয়

মাধ্যমিকে ভঙ্গুর দশা : সংকট দূর হবে কবে

দেশের শিক্ষা খাতে পদে পদে অসংগতি, অনিয়মÑনেই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই কোনো পরিকল্পনা। কোথাও শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক নেই। আবার কোথাও শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী নেই। নামে-বেনামে হাজারো প্রতিষ্ঠানÑসেখানে কী শেখানো হচ্ছে, কোনো জবাবদিহি নেই। এই পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে, কিন্তু দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। আবার শিক্ষকদের একটি বড় অংশের নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ। শুধু মাধ্যমিকে নয়, প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এমন সংকটে জর্জরিত। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল ১৯ হাজার ২১১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে বিদ্যালয় ছিল ১৯ হাজার ১১৭টি, আর শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ এক বছরে বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, কিন্তু শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখ আট হাজার ৫০৭ জন। এ তো গেল একটি দিক। খবরে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার ঘাটতিও স্পষ্ট। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি পড়েননি। আর গণিত শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতক পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা নেই। এদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমলেও মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তথ্য বলছে, এক বছরে আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। একই সময়ে মাদরাসার সংখ্যাও বেড়েছে। এমনকি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতেও আগের চেয়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে। কেন এমন হচ্ছে, এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। শিক্ষাজীবনের যে আঁতুড়ঘর, সেই প্রাথমিকেরও নানা অসংগতি সামনে আসে। ২০২৪ সালের প্রাথমিক শিক্ষা শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা এক লাখ ১৮ হাজার ৬০৭। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো বেসরকারি। এ ছাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা কত, তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। এদিকে শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট আরো বড়। এবার একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৬ লাখ আসন ফাঁকা থাকছে। আর দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার প্রত্যাশিত মানের ঘাটতি লক্ষণীয়। দেশের শিক্ষা খাতের সার্বিক অবস্থা এমন ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা’। তবে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার সংকট ভিন্ন ভিন্ন মনে হলেও এর পেছনের কারণ অভিন্ন। দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রয়োজনের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় থাকে না। এ কারণে শিক্ষাজীবন শেষ করেও একজন শিক্ষার্থী মৌলিক বোঝাপড়ায় পিছিয়ে থাকে। কাজের ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে পারে না। এই সংকটের বেড়াজাল থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমরা মনে করি, শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে হলে শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ সুফল দেবে না। শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতামত নিয়ে বাস্তবসম্মত শিক্ষাকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button