সম্পাদকীয়

বিদেশের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশিদের করুণ হাল

বৈধ কিংবা অবৈধ পন্থায় ভাগ্যান্বেষণে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের একাংশ আজ বিভিন্ন বিদেশের অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তার অভাবে প্রবাসীদের এই বন্দিত্ব কেবল তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেই ধ্বংস করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ করছে। এ অবস্থায় প্রথমত, মহাদেশ ও দেশভিত্তিক বাংলাদেশি বন্দিদের পরিসংখ্যান জানা প্রয়োজন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কারাগারে কয়েক হাজার বাংলাদেশি বন্দি আছেন। বিশেষ করে, ভারতের দমদম ও আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ১৫৭৯ জন এবং মালয়েশিয়ার কাজাং কারাগারে প্রায় ২১৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। যথাযথ ট্রাভেল পারমিট না থাকায় পাসপোর্ট আইনের ৩ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে তাদের অধিকাংশ সেখানে বছরের পর বছর আটক রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ৭৫০০ বাংলাদেশি বিভিন্ন অপরাধে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। এছাড়া ওমানের কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪২০ জন এবং ইরাকের আবু গরিব কারাগারে ২১৭ জন বন্দি আছেন। স্থানীয় শ্রম আইনের ধারা ৪২ এবং ইমিগ্রেশন বিধিমালার উপধারা ৫ লঙ্ঘনের দায়ে তাদের অধিকাংশকে গ্রেফতার করা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ডিটেনশন সেন্টারে বাংলাদেশিদের আটক থাকার সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গ্রিসের থেসালোনিকি কারাগারে ৪১৪ জন এবং তুরস্কের এদিরনে বন্দিশালায় ৫০৮ জন বাংলাদেশি চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে বিশেষ করে মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিশালায় অনেক বাংলাদেশি নাগরিক মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। মেক্সিকোর তাপা চুলা ডিটেনশন সেন্টারে বর্তমানে ৯৭ জন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইনের ধারা ১৪ এবং অবৈধ সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার উপধারা ৯ ভঙ্গের অপরাধে তাদের অধিকাংশকে সেখানে কঠোর নজরদারিতে আটক রাখা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬ এর ধারা ১৫ এবং উপধারা ৪ মোতাবেক ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর কাজ সম্পন্ন করতে হবে। দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা মিশনগুলোর অন্যতম প্রধান আইনি দায়িত্ব। দরিদ্র ও অসহায় বন্দিদের জরিমানার টাকা পরিশোধের জন্য বিশেষ আপদকালীন তহবিল গঠন ও তার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বিধিমালার ধারা ১৮ এবং উপধারা ৭ অনুযায়ী এই অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। মিশনগুলো এই বিধান প্রতিপালন করলে বহু বন্দি দ্রুত মুক্তি পেতে পারেন। বিদেশের কারাগারে বাংলাদেশি বন্দিদের এই চরম অমানবিক সংকট দূরীকরণে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে যথাযথ করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক বন্দিনীতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। দ্য ট্রান্সফার অব সেন্টেন্সড পারসন্স অ্যাক্ট ২০১৮ এর ধারা ৩ এবং উপধারা ১ এর অধীনে এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব। এর ফলে বন্দিরা নিজ দেশের কারাগারে বাকি সাজা খাটার সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button