বাড়ছে সিসাদূষণ : জরুরি পদক্ষেপ নিন

সিসা নীরব ঘাতক। গন্ধহীন, স্বাদহীন ও অদৃশ্য বিষাক্ত এই ভারী ধাতু মানুষের স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ধ্বংস করে। বিশেষ করে শিশুদের বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি রয়েছে, যা নানাভাবে মানবদেহে প্রবেশ করছে এবং ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে আটজনের শরীরে ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় সিসা রয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের শরীরেও ক্ষতিকর মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসার উপস্থিতি উদ্বেগজনক। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি বসবাসকারী ৮০.৬ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৪ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর প্রায় চারজন সিসার ঝুঁকিতে। অন্যদিকে গর্ভবতী নারীদের ৭.৫ শতাংশের রক্তেও সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমায় বা তার বেশি পাওয়া গেছে। বিবিএসের জরিপের বিভাগভিত্তিক হিসাব বলছে, শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতির হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগের ৬৫.২ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি। সিলেটে এই হার ৪৬.৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২.১ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৩০.৬ শতাংশ, বরিশালে ২৯ শতাংশ, রংপুরে ১৯.৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭.৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৫.৯ শতাংশ। জাতীয় গড় ৩৮.৪ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ’। প্রধান লক্ষ্য হলো, সিসার বিষক্রিয়া ঘটার আগেই দূষণের উৎস শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। সিসাদূষণের উৎস কী? শিল্পবর্জ্য, পুরনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার, দূষিত ধুলা-মাটি, রং ও বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে সিসা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া খেলনা, প্রসাধনী, খাবার, গৃহস্থালি পণ্য বা শহরের পরিবেশের দূষিত ধুলা-মাটি এর সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। রাজধানীতে পাইপের পানির সংযোগ থাকা পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারে শিশুদের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় সিসার উপস্থিতি দেখা গেছে। এসব বিষয়ে পৃথক ও বিস্তারিত গবেষণা হওয়া জরুরি। হতাশার দিক হলো, শিশুদের বিকাশে সিসা মারাত্মক ক্ষতিকর হলেও এ নিয়ে তেমন সচেতনতা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবে সিসার সংস্পর্শ মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। গর্ভাবস্থায় সিসার সংস্পর্শও উদ্বেগজনক। কারণ সিসা মায়ের শরীর থেকে ভ্রƒণের কাছে পৌঁছতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা কর্মকর্তা সুহান আহমেদ বলেন, সিসার বিষক্রিয়া গুরুতর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি হলেও তা প্রায়ই চোখে পড়ে না। এটি শিশুদের বিকাশ এবং সমাজে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য হুমকি। তাই বিষয়টিকে ছোট সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের বড় জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, সিসাদূষণ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য রক্ত ও পরিবেশগত নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ধারণ এবং দূষণের উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন। যেসব শিল্পবর্জ্য থেকে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করা দরকার। সর্বোপরি পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিল্প ও ভোক্তা সুরক্ষা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত অপরিহার্য।
