সাইবার সুরক্ষা আইন : সাংবাদিকদের উদ্বেগ আমলে নিন

সাইবার অপরাধের মাত্রা ও ধরন যেভাবে বাড়ছে, তাতে অনলাইন পরিসরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর আইন অনস্বীকার্য। তবে সেই আইনের সব দিক হওয়া চাই সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছÑঅপরাধের সংজ্ঞায় যেন কোনো ধোঁয়াশা না থাকে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, যেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা না পায়। কেননা এসব ফাঁকফোকর থাকার কারণে যে আইন মানুষের অধিকার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়, সেই আইন অনেকের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য বড় অন্তরায় হয়ে ওঠে। কাজেই প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্বেগ আমলে নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইন নিয়ে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা স্বস্তিকর নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা মত প্রকাশের পথ সংকুচিত করেছে। বিশেষ করে সাংবাদিক, লেখক, গবেষক এবং মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা সময় আইনের প্রয়োগ দেখা গেছে। মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টজনরা বলছেন, আইন পরিবর্তনের পরও সেসব আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। গত রবিবার রাজধানীতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’ প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। আইনে ‘ভুল তথ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ ছাড়া সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিরও বিরোধিতা করেন তিনি। আমরা মনে করি, তাঁর এই উদ্বেগ গোটা সাংবাদিকসমাজের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি করা হচ্ছে না। তবে আইনের মধ্যে কার্যকর রক্ষাকবচ না থাকলে ভবিষ্যতে তা সমালোচক বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনলাইনে সহিংসতার উসকানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, যৌন হয়রানি, প্রতারণা বা পরিকল্পিত ক্ষতি করার মতো অপরাধ দমনে কার্যকর আইনের বিকল্প নেই। কিন্তু সমালোচনা, ভিন্নমত এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। আমরা আশা করি, সরকার সাংবাদিকসমাজের উদ্বেগ আমলে নেবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
