মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, চাপে অর্থনীতি : শ্রমবাজারে চাই বৈচিত্র্য

দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, শিল্প খাতে স্থবিরতা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতিÑসামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটকে সামনে আনছে। এমন চতুর্মুখী সংকটের মধ্যেও প্রবাস আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। বলা যায়, ঘোর সংকটকালে এটিই ছিল স্বস্তির সূচক। কিন্তু সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই প্রবাস আয় নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও হতাহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের শ্রমবাজার নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আমাদের প্রবাস আয় সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার কারণে আকাশপথ বন্ধÑএ কারণে ঢাকা থেকে অন্তত ১০০ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেড় হাজারের বেশি সৌদিগামী যাত্রী আটকা পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেক প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, আবার অনেকের ছুটি শেষ হয়ে আসছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে না পারলে চাকরি, ভিসা ও কর্মস্থলে যোগদান নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞমহল মনে করছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই আটকে পড়া শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানো। এ বিষয়ে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান যথার্থই বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক কৌশলগত সেল গঠন করা প্রয়োজন। আটকে পড়া কর্মীদের তালিকা তৈরি, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, জরুরি সহায়তা এবং বিকল্প যাত্রাপথের ব্যবস্থা করতে পারে এই সেল। সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মীদের নিরাপত্তা, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়েও আগাম পরিকল্পনা থাকা দরকার।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে প্রবাস আয় বেড়েছে ১৭.৩০ শতাংশ। তবে আমাদের প্রবাস আয়ের বড় অংশ ঘুরেফিরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সৌদি আরব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের ১৬.১৩ শতাংশ। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে শক্তি আবার ঝুঁকিও বটে। বেশ কিছুদিন থেকেই বিশেষজ্ঞমহল দেশে শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়ে আসছে। গত বুধবার একটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ বিষয়ে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনতে ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। আমরাও মনে করি, প্রবাস আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখা দরকার, প্রবাস আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই তুলনায় এই খাতে নানা অনিয়ম রয়েছেÑসেগুলো দূর করা একান্ত প্রয়োজন।
