বিনোদন

গায়ক থেকে নায়ক, সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন জাফর ইকবাল

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ঢাকাই সিনেমার স্টাইলিশ নায়ক হিসেবে দেশের গ-ি পেরিয়েও যার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সিনেপ্রেমীদের মাঝে, তিনি জাফর ইকবাল। অভিনয়, গান আর ফ্যাশন- তিন ক্ষেত্রেই নিজের আলাদা ছাপ রেখে যাওয়া এই শিল্পী আশির দশকে হয়ে উঠেছিলেন তরুণদের ফ্যাশন আইকন। সময়ের চেয়ে যেন কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকা এই নায়ক আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন। জনপ্রিয় এই তারকার জন্ম ১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। ঢাকার গুলশানে জন্ম নেওয়া জাফর ইকবালের পৈত্রিক নিবাস সিরাজগঞ্জে। জন্মের পর থেকেই যেন সুর আর শিল্পের আবহে বেড়ে ওঠা তার। ছোটবোন খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং বড় ভাই স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ- দুজনই ছিলেন সংগীতজগতের পরিচিত মুখ। তাদের দেখেই ছোটবেলা থেকে গান গাওয়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় জাফর ইকবালের। গানের পাশাপাশি গিটার বাজানোতেও ছিল তার আলাদা দক্ষতা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কাছে গান শেখেননি তিনি। তবে সুরের ভুবনে বেড়ে ওঠার কারণে গান না শিখেও অনায়াসে গাইতে পারতেন। প্রিয় শিল্পী ছিলেন এলভিস প্রিসলি। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিটার বাজিয়ে এলভিসের গান গাইতেন তিনি। ১৯৬৭ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে ‘র‌্যাম্বলিং স্টোনস’ নামে একটি ব্যান্ড গড়ে তোলেন জাফর ইকবাল। একসময় ব্যান্ড নিয়েই বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সেই ব্যান্ডের একটি কনসার্টে গান গাওয়ার সময় তার প্রতিভা নজরে আসে কিংবদন্তি খান আতাউর রহমানের। মঞ্চে সুদর্শন এই তরুণের প্রাণবন্ত পরিবেশনা মুগ্ধ করেছিল তাকে। চলচ্চিত্রে জাফর ইকবালের অভিষেকও হয়েছিল গান দিয়ে। ‘পিচঢালা পথ’ চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন তিনি। এরপর ১৯৬৯ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে নায়ক হিসেবে পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। বিপরীতে ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী কবরী সারোয়ার। প্রথম সিনেমাতেই দর্শকের নজর কাড়েন জাফর ইকবাল। সিনেমাটির ‘যারে যাবি যদি যা’ গানটিও দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জাফর ইকবাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। স্বাধীন দেশে রাজেশ খান্না অভিনীত ‘রোটি’র রিমেক সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। ইবনে মিজান পরিচালিত ‘এক মুঠো ভাত’ সিনেমায় ‘শোনো ভাইয়েরা কথা শোনো এমন একজন মানুষ আনো, যে জন পাপ না করেছে, যে পাপী নহে’ গানে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশা থেকে বিপথগামী তরুণের চরিত্রে পরিচালকদের অন্যতম পছন্দ ছিলেন জাফর ইকবাল। সামাজিক প্রেমকাহিনি ‘মাস্তান’-এ নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে রোমান্টিক নায়ক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। ১৯৭৫ সালে ‘মাস্তান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় তাকে সে প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে ঢালিউডে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। জাফর ইকবালের অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা প্রায় ১৫০টি, যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসাসফল। ১৯৮৯ সালে ত্রিভুজ প্রেমের গল্পের সিনেমা ‘অবুঝ হৃদয়’ দারুণ ব্যবসাসফল হয়। এতে চম্পা ও ববিতার বিপরীতে অভিনয় করে দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা পান জাফর ইকবাল। বিশেষ করে ববিতার সঙ্গে তার জুটি ছিল দর্শকনন্দিত। তাদের বাস্তব জীবনে প্রেমের সম্পর্ক ছিল- এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছিল সে সময়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়েই জাফর ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন- এমন জোর গুঞ্জনও ছিল। ববিতার বিপরীতে ‘সূর্যসংগ্রাম’ ও এর সিকুয়াল ‘সূর্যস্বাধীন’সহ প্রায় ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। তার সময়ের প্রথমসারির ও ব্যস্ততম অভিনেত্রী শাবানা, কবরী, ববিতা, চম্পা ও দিতির বিপরীতে সাবলীল অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে শুধু অভিনয় নয়, জাফর ইকবালের আরেকটি পরিচয় ছিল গায়ক হিসেবে। বেশ কিছু সিনেমায় গায়ক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। সেগুলোও দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় একসময় গানে আগের মতো সময় দিতে পারেননি। ফলে তার গড়া ব্যান্ডটিও একপর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়ে। তবুও গান থেকে তার জনপ্রিয়তা কখনো হারিয়ে যায়নি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আনন্দমেলা’য় বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন জাফর ইকবাল। আশির দশকের মাঝামাঝি নিজের গাওয়া গান নিয়ে প্রকাশ করেন একক অ্যালবাম ‘কেন তুমি কাঁদালে’। তার জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে- ‘যেভাবেই বাঁচি, বেঁচে তো আছি, জীবন আর মরণের কাছাকাছি’, ‘শেষ করো না, শুরুতেই খেলা, না ভেঙো না’, ‘বিদেশ থেকে দেশে আইলে’সহ আরও অনেক গান। সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে প্রায় ২০০টি গান গেয়েছেন তিনি। জাফর ইকবাল ছিলেন তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন শিল্পী। আশির দশকের ঢালিউডে তার মতো আধুনিক ও স্মার্ট শিল্পী খুব বেশি ছিলেন না। হাফহাতা গেঞ্জি, চোখে সানগ্লাস কিংবা চুলের বাহারি স্টাইল- সবকিছুতেই তিনি ছিলেন আলাদা। তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি ছেলেবুড়ো সবার কাছেই ছিল তার সমান জনপ্রিয়তা। বুকপকেটে জাফর ইকবালের ছবি নিয়ে ঘুরতেন অনেক তরুণী-এমন স্মৃতিও রয়েছে সেই সময়কে ঘিরে। অভিনয় ও ফ্যাশনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সময়ের ক্রেজ। জাফর ইকবাল অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে- ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘ভাই বন্ধু’, ‘চোরের বউ’, ‘অবদান’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, ‘ফকির মজনুশাহ’, ‘দিনের পর দিন’, ‘মিস লংকা’, ‘আবিষ্কার’, ‘বিরহ ব্যথা’, ‘অংশীদার’, ‘মেঘবিজলী বাদল’, ‘সাত রাজার ধন’, ‘আশীর্বাদ’, ‘অপমান’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘নয়নের আলো’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘প্রেমিক’, ‘নবাব’, ‘প্রতিরোধ’, ‘ফুলের মালা’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘সিআইডি’, ‘মর্যাদা’, ‘অবুঝ হৃদয়’ ও ‘সন্ধি’। ক্ষণজন্মা এই নায়ক ও গায়ক ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের পথচলা থেমে যায় অকালেই। কিন্তু থেমে যায়নি তার সৃষ্টি, থেমে যায়নি তার জনপ্রিয়তা। বেঁচে আছেন তার গান, অভিনয়, ফ্যাশন আর অসংখ্য স্মৃতির ভেতর। সময় বদলেছে, বদলেছে চলচ্চিত্রের ভাষা; কিন্তু ঢালিউডের সেই স্টাইলিশ নায়ক আজও অগণিত ভক্তের হৃদয়ে চিরসবুজ এক নাম- জাফর ইকবাল।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button