গরিবের বাজার : বর্জ্যের বিনিময়ে মিলছে মাছ-মাংস

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ পকেটে টাকা নেই, কিন্তু বাসাবাড়িতে জমে থাকা প্লাস্টিক, পলিথিন, পরিত্যক্ত কাগজ কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আছে। তাহলে এসবের বদলে আপনি কিনতে পারবেন চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, লবণ, চিনি, আলু, মাছ, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এমনকি টুথ-ব্রাশ, পেস্ট, গেঞ্জি, স্কুল ব্যাগ, রান্না করা খাবারও পাওয়া যায় এসব বর্জ্যের বিনিময়ে। ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’, অনেকের কাছে এটি গরিবের বাজারÑযেখানে টাকার পরিবর্তে মুদ্রা হচ্ছে ফেলে দেওয়া বর্জ্য। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে দুটি, হাজারীবাগ ২টি, মিরপুরের ১টি আছে এই ব্যতিক্রমী বাজার। সম্প্রতি রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর আশরাফাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই বস্তা, ব্যাগ কিংবা ঝুড়ি ভর্তি প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আসছেন স্থানীয় নিম্ন আয়ের বাসিন্দারা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে অস্থায়ী এই বাজার। অস্থায়ী বাজারের প্রবেশ মুখের পাশেই বর্জ্য জমা দেওয়ার ব্যবস্থা। এই বাজারের ক্রেতারা প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, কাগজ, কাচসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সেখানকার স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা নির্দিষ্ট বর্জ্য এবং ওজন অনুযায়ী তাদের একটি করে টোকেন দিচ্ছেন। বর্জ্যের বিনিময়ে পাওয়া সেই টোকেন দিয়ে চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলু, মাছ ও মুরগিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য সংগ্রহ করেন ক্রেতারা। কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর এলাকা থেকে বাজার করতে আসা আজমলা বেগম বলেন, টানাটানির সংসার। বাজার করার টাকা নেই। বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা বোতল-প্লাস্টিকগুলো দিয়ে যদি কিছু খাবার পাওয়া যায়, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। বর্জ্যের বিনিময়ে বাজারের এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, পাঁচ কেজি বর্জ্য দিয়ে বাজার করতে আসলাম দেখি কি কিনতে পারি। মুসলিম বাগের বাসিন্দা তোফাজ্জল মিয়া বলেন, আগে এসব প্লাস্টিক ফেলে দিতাম। এখন বুঝি এগুলোরও মূল্য আছে। একদিকে ঘর পরিষ্কার হলো, আবার তার বিনিময়ে পরিবারের জন্য বাজারও নিতে পারলাম। সরকারের কাছে দাবি এই বাজার যেন বন্ধ না হয়। বাজারের বিক্রেতা ও স্বেচ্ছাসেবক রামিম ফয়সাল বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ বর্জ্যের নিত্য পণ্য নিচ্ছেন। তাদের চোখে-মুখে যে আনন্দ দেখা যাচ্ছে, সেটাই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তিনি বলেন, এই উদ্যোগে একদিকে যেমন তাদের উপকার হচ্ছে আবার একইসঙ্গে শহরটাও পরিষ্কার হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীতে বসানো হয়েছে এসব ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’। এই উদ্যোগটি শুধু এক দিন বা এক এলাকার কর্মসূচি না। ধীরে ধীরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ও ওয়ার্ডে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা খুব আশাবাদী এবং প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা করা নয়, তাদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশীদার করা। আমরা এর আগে ও এই কার্যক্রম চালু করেছিলাম। গত দুই বছরে সংগৃহীত প্লাস্টিক বর্জ্য বিক্রি করে প্রায় এক কোটি টাকা আয় হয়েছে। সেই অর্থ দিয়ে প্রায় চার লাখ মানুষকে খাবার দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তিনি বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে বর্জ্যকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদে রূপ দেওয়ার একটি মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। একটি প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিনের ব্যাগ যেখানে সাধারণত ডাস্টবিনে গিয়ে শেষ হয়, সেটিই এখন পরিণত হচ্ছে চাল-ডাল-তেল কিংবা অন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার বিনিময়মূল্যে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে জামাল উদ্দিন বলেন, প্রকল্পের আওতায় আগামী এক বছরে ১০০টি ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাসে গড়ে আটটির বেশি ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হলেন এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, এই কর্মসূচির ফলে প্রচুর বর্জ্য জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে আমরা একদিকে নগরকে বর্জ্যমুক্ত রাখতে পারব, অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের বাজার সহায়তা পাচ্ছে। আশা করি নগরবাসী এর সুফল দেখতে পাবে। তিনি বলেন, যে বর্জ্য গুলো পুনর্ব্যবহার করা যায় সেগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে, আর বাকি ময়লাগুলো সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। গরিবের বাজারগুলো উদ্বোধনকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ নাগরিকদের সেই কাজে উৎসাহিত করার একটি কার্যকর উদ্যোগ। তিনি বলেন, ড্রেন ও নালা-নর্দমায় প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য জমা দিলে একদিকে জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক বলেন, শুধু বাজার বসিয়ে থেমে থাকতে চায় না ডিএসসিসি। শিগগিরই গুলিস্তানে ডিএসসিসির উদ্যোগে একটি স্থায়ী স্টল স্থাপন করা হবে। পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেও এ কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র বা এসটিএসের সুবিধাজনক জায়গায় পথশিশুদের জন্য চেয়ার-টেবিল ও বইয়ের ব্যবস্থা করে ‘বই পড়ার বিনিময়ে খাবার’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান ডিএসসিসি প্রশাসক।



