কাশ্মীরে মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবার প্রস্তাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ভারতশাসিত কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ড। এ প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মুসলমানদের ধর্মীয় পরিসরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে সরকার। জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডের প্রধান দারাক্ষান আন্দ্রাবি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় একজন নেতা। ২০১৯ সালে মোদি সরকার কাশ্মীরের আগের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এর আগে অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হতো। ইসলামি আইন অনুযায়ী মুসলমানদের ধর্মীয় দাতব্য সম্পত্তি তদারকির দায়িত্বে থাকা ওয়াক্ফ বোর্ড গত সপ্তাহের শেষ দিকে বিতর্কিত এ উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কাশ্মীরের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম ধর্মীয় প-িতেরা এ প্রস্তাবকে ‘কাশ্মীরি মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে নিন্দা জানান। অভিন্ন খুতবা চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দ্রাবি ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেন, বোর্ডের অধীনে গঠনের প্রস্তাব করা একটি কমিটি ‘অভিন্ন খুতবার বিষয়টি চিহ্নিত করার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবে’। তিনি বলেন, মাদকাসক্তিসহ অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক অনাচার মোকাবিলায় এ পদক্ষেপ প্রয়োজন। আন্দ্রাবি সংবাদমাধ্যমকে আরও বলেন, জুমার খুতবা অনুমোদন করবেন ধর্মীয় প-িতেরা। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের কোনো কর্মকর্তার ভূমিকা থাকবে না। রোববার কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় প-িত ও খতিবকে তলব করে ওয়াক্ফ বোর্ড। তাদের কেউ কেউ সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে ভার্চ্যুয়ালি সভায় যোগ দেন। অঞ্চলটির বৃহত্তম শহর শ্রীনগর থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের পার্বত্য জেলা রাজৌরির এক ধর্মীয় প-িত অনলাইনে ওই সভায় অংশ নেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আন্দ্রাবি নির্দেশনা দিয়েছেন যে জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় প-িতদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির আগাম অনুমোদিত খুতবাই প্রতি শুক্রবার মসজিদের মিম্বরে অভিন্নভাবে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি বলে জানান তিনি। ওই ধর্মীয় প-িত বলেন, আমরা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলাম, খুতবায় ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি কিছু থাকলে আমরা নির্দেশনা মানব না। কিন্তু তিনি আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেন এবং কথা বলতে দেননি। কর্তৃপক্ষের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, আন্দ্রাবি বলেছেন, তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কারণ, এ পরিকল্পনা নিয়ে চার বছর ধরে কাজ চলছে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের দাবির মুখে থাকা কাশ্মীর গত চার দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। কাশ্মীরিরা কোন দেশের সঙ্গে থাকতে চান, তা নির্ধারণে গণভোটের দাবিতে বছরের পর বছর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়েছেন। পরে ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের জেরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ২০১৯ সালে ভারত কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই বছর স্থানীয় সরকার পুনর্নির্বাচিত হলেও তার ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়। বাস্তবে এখনো নয়াদিল্লি-নিযুক্ত প্রশাসকের হাতে কর্তৃত্ব রয়েছে। আগের বিশেষ মর্যাদার আওতায় কাশ্মীরিদের জমি ও আবাসসংক্রান্ত বিশেষ অধিকার সুরক্ষিত ছিল। পাশাপাশি নিজেদের আইন প্রণয়নের সুযোগও ছিল তাদের। ২০১৯ সালের সিদ্ধান্তের অন্যতম পরিণতি হলো, মুসলমানদের বৃহত্তর সামষ্টিক কল্যাণে উৎসর্গ করা দাতব্য সম্পত্তি ওয়াক্ফ পরিচালনার স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত আইন কার্যকর করা হয়। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা।



