খুলনা বিভাগে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে : তবুও কৌশলে চলছে বিকিকিনি

ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে, মোটরসাইকেলে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে, স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পরে, পাগল ও ভিখারির বেশে এবং ভ্রাম্যমাণ হকার সেজে অনেক ব্যবসায়ী মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে মাদক
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের জানুয়ারিতে অভিযান ১০৪৮টি, মামলা ২৩৭ ও আসামি ২৫০ জন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে’তে মাদকসহ আটক ২, উদ্ধার হওয়া মাদকের মূল্য ৬২ লাখ সাড়ে ১১ হাজার টাকা
কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনা বিভাগে মাদক ঢুকছে বিভিন্ন রূট থেকে। ধরাও পড়ছে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরণের মাদকের চালান। কেএমপি এলাকার প্রবেশ মুখে কেএমপি পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে, বিভিন্ন স্পটে অভিযান চালিয়ে এত মাদকসহ মাদককারবারীদের ধরছে তবু যেন থামছে না মাদকের বিকিকিনি। খুলনা বিভাগে কৌশলে চলছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। মাদক ব্যবসায়ীরা প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন। খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপÍরের একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমান মাদকসহ মাদক ব্যবসায়ীরা আটক হওয়ায় বিষয়টি সামনে আসে। খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর গত দেড় মাসে বিপুল পরিমান মাদকসহ আসামিদের আটক করেছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেয়া তথ্য মতে, শুধুমাত্র এ দেশে নয় ; বিশ্বব্যাপী মাদক উৎপাদন, বিক্রি ও আসক্তদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে। অপরাধ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে মাদকাসক্তদের সংখ্যা। কোন সুস্থ মানুষ অপরাধ করতে পারে না। সে অবশ্যই মানষিকভাবে অসুস্থ্য। তাদের দেয়া তথ্য মতে, দেশে ৯৯ ভাগ মামলা হয় মাদক নিয়ে। খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ১০৪৮টি অভিযানে মামলা ২৩৭ ও আসামি ২৫০ জন করা হয়। এ সময়ে অভিযান চালিয়ে ১০৩ বোতল ফেনসিডিল, গাজা ২১ কেজি ৮২৪ গ্রাম, ইয়াবা ৮ হাজার ৭৬ পিস, বিলাতী মদ ১০ বোতল, টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ৯০৬ পিস, হিরোইন ৩৭ দশমিক ৫ গ্রাম, চোলাইমদ ৫ লিটার, বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন ৮ অ্যাম্পুল, তাড়ি ২১৩ লিটার, অ্যালকোহল ২ দশমিক ৮ লিটার, জাওয়া ৩০ লিটার, ডিনোচার্ট স্প্রিট ২০ লিটার, গাজার গাছ ১টি, অ্যাম্বুলেন্স একটি, মোটরসাইকেল ২টি, মোবাইল ফোন ৬টি এবং নগদ টাকা ২৩৯০ টাকা। এছাড়া চলতি মাসে ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি খুলনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের ফকিরহাট উপজেলা লকপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান মাদকসহ দুই জন আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত দুইটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। আটককৃতরা হচ্ছে মো: ফয়সাল হোসেন (২৩) এবং সোহেল রানা (২৬)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৯৪ কেজি গাজা, ১ হাজার ৫২০ পিস ইয়াবা এবং ৩৩ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করা হয়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ে ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল আটক করা হয়। খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো: আহসানুর রহমানের নেতৃত্বে বিশেষ এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন খ্লুনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: মিজানুর রহমান। খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো: আহসানুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, চলতি বছরের এই প্রথম খুলনা বিভাগের মধ্যে এতো বড় মাদকের চালান আমরা আটক করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা যতই কৌশল অবলম্বন করুন না কেনো। আমাদের বিভাগের একাধিক টিম মাদক কারবারীদের ধরতে সব সময় মাঠে রয়েছেন। আমাদের জালে মাদক ব্যবসায়ীরা আটক হচ্ছেন।
খ্লুনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: মিজানুর রহমান বলেন, মাদক দমনে খুলনায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। চলতি বছরে জানুয়ারি মাসে খুলনা বিভাগে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ১০৪৮টি অভিযানে মামলা ২৩৭ ও আসামি ২৫০ জন করা হয়। এছাড়া ১৪ ফেব্রুয়ারি ফকিরহাট উপজেলায় লকপুরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান গাজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। এসময় দুইজকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় ‘ক’ সার্কেলের একটি টিম উপস্থিত ছিলেন। ‘ক’ সার্কেলের উপ-পরিদশর্ক মো: রাকিবুল ইসলাম রাসেল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘ক’ সার্কেলের পরিদর্শন মো: আব্দুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কৌশলে মাদক কারবারীরা মাদক বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ডিসেম্বর- ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত গাজা মৌসুম হিসেবে ধরা হয় বলে বিভিন্ন সময় আটককৃত মাদক ব্যবসায়ীদের বক্তব্য। যার কারণে বর্তমানে গাজা উদ্ধারের সংখ্যা বর্তমানে বেশি। এছাড়া অন্যান্য মাদক তো আছে। তিনি বলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ফকিরহাট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান গাজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় দুইজনকে আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত ফয়সাল পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া উপজেলার টিকিকাটা গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। আর সোহেল রানা একই এলাকার আব্দুল লতিফ খলিফার ছেলে। এরা ওই বাড়ীর ২য় তলা ভাড়া নিয়ে মাদকের বেচা-কেনা করত বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। তাদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়, বর্তমানে বাজার দর অনুযায়ী আনুমানিক মুল্য ৬২ লাখ ১১ হাজার ৫শ’ টাকা। এ মাদকের চালনের মূল হোতা হচ্ছে আখতার। সে কক্সবাজার এলাকাতে থাকে। তাকেও এ মামলায় পলাতক হিসেবে আসামি করা হয়েছে। আর যারা মাদকসহ আটক হয়েছে তারা ইতিপূর্বে মাদককের চালান বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছায় দিতেন বলেন প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। কিন্তু এই প্রথম মাদকসহ তারা আটক হয়েছে। এ ঘটনায় ক সার্কেলের উপ-পরিদর্শক মোঃ রাকিবুল ইসলাম বাদী হয়ে ফকিরহাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা ঘরভাড়া নিয়ে গোপনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে, মোটরসাইকেলে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে, স্কুল কলেজের ইউনিফরম পরে, পাগল ও ভিখারির বেশে এবং ভ্রাম্যমাণ হকার সেজে অনেক ব্যবসায়ী মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে গাজা, মদ, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সামগ্রী। এসব কৌশলে নগরীর শতাধিক স্থানে প্রতিদিন মাদক বিকিকিনি হচ্ছে। স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম- মহানগরীর বার্মাশীল এলাকা, রয়েলের মোড়, সাত রাস্তার মোড়, তালতলা, ষ্টেশন রোড, ৪ ও ৫ নং ঘাট, হেলাতলা, নতুন বাজার, ২নং কাস্টম ঘাট, টিবি ক্রস রোড, শিল্প ব্যাংক ভবনের পিছনের বস্তি, পিটিআই মোড়, টুটপাড়া, শেখপাড়া, গোবরচাকা মেইন রোড, সোনাডাঙ্গা ট্রাক স্ট্যান্ড, সোনাডাঙ্গা বাইপাস রোড, নবপল্লী, গল্লামারী, বয়রা ইসলামিয়া কলেজ মোড় সংলগ্ন (শেরের মোড়), খালিশপুর, দৌলতপুর বাজার, পাবলা, রেলিগেট, ফুলবাড়িগেট, ফুলতলা, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গোবরচাকা মধ্যপাড়া, পশ্চিম বানিয়াখামার, সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড, শিববাড়ি, নিউমার্কেট, হাউজিং বাজার, হাউজিং নিউ কলোনি, আলমনগর, বিআইডিসি রোডের বন্ধ গেট, চিত্রালী বাজার, সদর হাসপাতাল এলাকা, মর্ডাণ ফার্নিচার মোড়, খানজাহান আলী রোড এলাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা মহানগরীর স্বল্প মূল্যের আবাসিক হোটেলগুলোতে ইয়াবার ব্যবহার বেশি। যুব সমাজও বেশ আসক্ত হয়ে পড়েছে এর প্রতি। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার মাদকসেবীরা নেশা হিসেবে হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ, তাড়ি, ডিটি জেসিক ইনজেকশন ও ডিএস ¯িপরিট সেবন করে আসছে। এছাড়া ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মাদকসেবীরা আইপিল, সিডাক্সিন, ইনোকটিন, ব্যথানাশক জামবাক, বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন, টাপেন্টাডল ট্যাবলেট। কিশোররা ডান্ডি গাম নামক জুতা তৈরির সলিউশন নেশার বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখন স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় আসক্ত।



