স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় দিন দিন আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে জনমনে উদ্বেগ

# ফিল্ম স্টাইলে ব্যবসায়ীর ওপর হামলা-গুলি
# আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন
# পত্রিকা অফিসের সামনে থেকে বোমা উদ্ধার
# সবচে বেশি অবনতি সোনাডাঙ্গা মডেল থানা এলাকায়
# পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্যের উপস্থিতিতে ব্লক রেইড অব্যাহত : ডিসি সাউথ

কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনা মহানগরীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন কেবলই অবনতির দিকে যাচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলা, সংঘর্ষ, খুন ও লুটপাটের মতো ঘটনা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। ফ্লিম স্টাইলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-গুলি বর্ষণ. এমনকি পত্রিকার অফিসের সামনে থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীরা বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারির অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা ঘটার পর অপরাধীদের শনাক্ত করে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এছাড়া আগের মতো নগরীতে গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি)র কর্মকর্তাদের কোন ধরনের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার বা অভিযান চোখে পড়ছেন না। মনে হচ্ছে ডিবি’র উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এক প্রকার নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। যার ফলে তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তারাও রয়েছে চুপ। এতে অপরাধীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোয়েন্দা বিভাগসহ বিভিন্ন থানার পুলিশের যে সব উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা এখনো যারা কর্মরত আছেন তাদের ভুমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু পুলিশ বলছে গতকাল বিকাল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ওই এলাকাগুলিতে ব্লক রেইড পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। জানা যায়, ৫ নভেম্বর (মঙ্গলবার) রাত সাড়ে ১১টায় নগরী সোনাডাঙ্গা মডেল থানাধীন বসুপাড়া এতিমখানার মোড় এলাকায় পুর্ব শত্রুতার জের ধরে যোগে বাপ্পি, রিপন, ডলার, ইমরান. ইভানসহ অজ্ঞাতনামা আরো পাঁচজনসহ মোট ১০ জন ফিল্ম স্টাইলে পাঁচটি মোটরসাইকেলে এসে মো: রফিকুল ইসলাম মুক্তা (৩৮) নামে এক ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তার স্ত্রীর সামনে টেনে হিঁচড়ে বের করে ৩ রাউন্ড গুলি করে যার কোনটিই অলৌকভাবে রফিকুল ইসলাম মুক্তার গায়ে লাগেনি। এরপর তারা এর আগে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে মুক্তাকে। এ সময় তাদের গুলিতে কেউ হতাহত হয়নি। পরবর্তীতে মুক্তার আত্মীয় স্বজন তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হামলার সময় মুক্তা তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসা ছিলেন। মুক্তার ব্যবসার প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা থাকায় হামলার পুরো দৃশ্যগুলো ওই সিটি ক্যামেরায় ধারন হয়। সেই ফুটেজ এই প্রতিবেদকের কাছে এসে পৌছায়। সিসি ফুটেজে দেখা যায়, ৫টি মোটরাইকেল যোগে আসা প্রথমে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সামনে এসে থামে। ওই সময় সবার মুখে মাস্ক পড়া ছিলো। এ সময় মটরস্ইাকেল থেকে নেমে হলুদ গেঞ্জি পরা ও মুখে ম্স্কা পড়া এক ব্যক্তি প্রথমে ওই ব্যবসার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে মুক্তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে আসে। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানে মুক্তার স্ত্রী বসা ছিলো। ওই সময় সে তার স্বামীকে বাচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। এর পরের মুহুর্তে সাদা গেঞ্জি পড়া এক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র চাপাতি দিয়ে মুক্তার গায়ে কোপ মারে। কয়েকজন হাতে রাম দাও দেখা যায়। পরে তারা তিন রাউন্ড গুলি করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল এসে তিনরাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছেন। এ ব্যাপারে সোনাডাঙ্গা মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। সেখান রাস্তায় পড়ে থেকে তিন রাউন্ড গুলি উদ্ধার করি। তিনি বলেন, জমি-জমা সংক্রান্ত জের ধরে তার ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় বাপ্পি, রিপন, ডলার, ইমরান. ইভানসহ অজ্ঞাতনামা আরো ১০ জন ছিলো বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় এখনো কেউ অভিযোগ দিতে আসেননি। মুক্তাকে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যায়, হামলায় কালা বাবলু, নাছির ও অমিত ছিলো। এর আগে গত ২ নভেম্বর দিবাগত রাত ২টার দিকে রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেল (২৭) দুর্বৃত্তের গুলি ও কোপের আঘাতে নিহত হয়। মহানগরীর শেরেবাংলা রোডস্থ আলকাতরা মিলের পার্শ্বে ১ নং গলির প্রবেশপথে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে ও চাপাতি দিয়ে হত্যা করে। এসময় তার সাথে থাকা সদর হাসপাতালের পিছনের হুমায়ুন কবিরের ছেলে মোঃ সজিব (২৫) ও শেরেবাংলা রোড আমতলার মোড়ের মোঃ হান্নান শেখের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াসিনকে (২৬) ধারালো চাপাতির কোপে রক্তাক্ত জখম করে। নিহত রাসেল মহানগরীর শেরেবাংলা রোডের আমতলার মোড়ের আব্দুল মান্নানের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১১ টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাদকের টাকার লেনদেনকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে একাধিক সূত্র দাবি। এ ঘটনায় নিহত পঙ্গু রাসেলের বোন বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন বলে সোনাডাঙ্গা মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান। গত ৩ নভেম্বর সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন খুলনা জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মো: হাবিবুর রহমান বেলাল। আহত বেলাল খুলনা জেলা স্কুল এলাকার বাসিন্দা জনৈক আ: লতিফের ছেলে। জানা যায়, ওই দিন রাত দেড়টার দিকে বেলাল মোটরসাইকেলযোগে কমার্স কলেজের দিকে যাচ্ছিলেন। ডা: মিজানুর রহমানের চেম্বারের সামনে পৌঁছামাত্র পেছন থেকে ২ থেকে ৩ টি মোটরসাইকেল তার গতিরোধ করে। মোটরসাইকেলে থাকা সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্রদিয়ে বেলালের বাম হাতের কব্জিতে ও ডান হাটুতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। এর আগে খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খুলনাঞ্চল পত্রিকার অফিসের সামনে থেকে লাল টেপে মোড়ানো ককটেল উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। প্রেসক্লাবের নির্বাহী সদস্য ও দৈনিক খুলনাঞ্চল পত্রিকার সম্পাদক মিজানুর রহমান মিলটন বলেন গত ২৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা সদর থানাধীন ৫ ইসলামপুর রোডস্থ দৈনিক খুলনাঞ্চল পত্রিকার অফিস রুমের সামনে কাঠের দরজার ডান পাশে ককটেল স্বাদৃশ্য লাল টেপে মোড়ানো প্রায় ৩০০ গ্রাম ওজনের কৌটার মত পড়ে থাকতে দেখা যায়। অফিসের কেয়ার টেকার রমজান নিজেই ব্যবস্থা নিয়ে পানির বালতিতে রেখে দেয়। পরে পুলিশ এসে বালতির পানিতে ভিজানো ককটেলটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় উদ্বেগ জানায় খুলনা প্রেসক্লাব। খুলনা প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, একটি গণমাধ্যম অফিসের সামনে ককটেল রাখার এ ধরনের কর্মকান্ড গণমাধ্যম ও মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। দিনের বেলায় একটি গণমাধ্যম অফিসের সামনে ককটেল রেখে যারা নাশকতা চালাতে চায় তাদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দাবি জানান নেতৃবৃন্দ। একইসাথে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা। খুমেক হাসপাতালের সূত্র মতে, প্রতিদিনই খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিপক্ষের হামলা ও সংঘর্ষে শিকার হয়ে আহত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে আসার ঘটনাও রয়েছে। কেউ বা মৃত অবস্থায় আসছেন। কেউ বা গুরুতর আহত অবস্থায় আসার পর অনেকেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত বরনও করেছেন। কেউ বা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে উন্নতি চিকিৎসার জন্য বাইরেও রেফার্ড হচ্ছেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপির) কমিশনার মো: জুলফিকার আলী হায়দার গতকাল বুধবার রাত ৮টায় মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু বলেন, “এব্যাপারে আমাদের কেএমপি পুলিশের প্রায় দেড়শতাধিক সদস্যের উপস্থিতিতে ওই এলাকাগুলোতে বিকেল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ব্লক রেইড পরিচালনা করেছি। আমরা বাড়িতে বাড়িতে তল্লাসী ও কিছু কিছু এলাকার কয়েকটি স্থান সিল করেছি। আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে । পঙ্গু রাসেল হত্যাকা-ের ঘটনায় ওই রাতেই এজাহার নামীয় ১, ২ ও ৩নম্বর আসামী গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়াও আমাদের বিশেষ অভিযান চলমান থাকবে। বসুপাড়া এতিমখানার মোড় এলাকায় ব্যবসায়ী মুক্তার উপর হামলার ঘটনার বিষয়ে সিসি ফুটেজ আমাদেরও হাতে এসেছে। আসামী ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।”

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button