স্থানীয় সংবাদ

শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর আজিম বাহিনীর ৬ সদস্য গ্রেফতার : পিস্তল, গুলি ও ম্যাগজিন উদ্ধার

গ্রেফতারকৃতরা টুটপাড়া ও সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত
নগরীতে সন্ত্রাসীদের টার্গেট ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ একের পর এক হামলা-ভাঙচুরেও মুখ খুলছে না কেউ

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনায় অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগজিনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর আজিম বাহিনীর ৬ জন সক্রিয় সদস্যকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার ভোর ৫টা পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে খুলনা সদর থানা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। কেএমপি খুলনা সদর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লোকমান হোসেনসহ থানার একটি দল এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
গ্রেফতাররা হচ্ছে, মোঃ মকবুল শেখের পুত্র সবুজ শেখ (২৮), ঝন্টু হাওলাদারের পুত্র বিশ্বজিৎ হাওলদার (২৭), মোঃ জাহাঙ্গীর হাওলাদারের পুত্র তাসিন ওরফে কাজল (২০), মোঃ হায়দার আলী সরদারের পুত্র রব্বানী সরদার (২৮), হাবিবুর রহমানের পুত্র সাইফুল ইসলাম (২০) ও মৃত শেখ নুর ইসলামের পুত্র রাসেল শেখ (২৫)। গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘ দিন ধরে নগরীর টুটপাড়া ও সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও অন্যান্য নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত ছিল।
পুলিশ জানায়, শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার ভোর ৫টা পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর আজিম বাহিনীর সক্রিয় উক্ত ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে সবুজ শেখের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড তাজা গুলি এবং একটি ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, গ্রেফতার আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে চক্রের মূলহোতা নূর আজিমের প্রত্যক্ষ নির্দেশে নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি সংস্থা এবং কোচিং সেন্টারে গিয়ে হুমকি-ধামকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। গ্রেফতার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অভিযানের বিষয়ে খুলনা সদর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সন্ত্রাসী নুর আজিম বাহিনীর সদস্য। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের এই বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
খুলনায় সন্ত্রাসীদের টার্গেট ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ : খুলনা নগরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পড়েছে। গত ১৭ দিনের ব্যবধানে চাঁদার দাবিতে তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময়ের মধ্যে প্রকাশ্য একটি’র চিকিৎসককে প্রকাশ্য অস্ত্র দিয়ে হুমকিও প্রদর্শন করে তারা। এছাড়া বন্ধ রয়েছে একটি ওষুধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। একের পর এক হামলা-ভাঙচুরেও মুখ খুলছে না কেউ। সবার মধ্যেই এক ধরনের জুজু’র ভয় কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরের শীর্ষ এক সন্ত্রাসীর একান্ত সহযোগীর শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য বাবুখান রোডের সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে যান। কিন্তু কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় ২৪ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তরা সেখানে হামলা চালায়। তারা দু’জন চিকিৎসকের রুম, কাউন্টার এবং একটি টিভি ভেঙে ফেলে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা সেখানে গুলি করে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে পরদিন সকালে একই মালিকের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে দুর্বত্তরা সশস্ত্র মহড়া দেয়। ওই দিন তারা সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেও তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনা ছাড়াও খুলনার ওই শীর্ষ বাহিনীর প্রধানকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখা হয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর সমসুর রহমান রোডের আব্দুল্লাহ প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ক্যান্সরের স্যাম্পল সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে এ হামলার কথা প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও পরবর্তীতে চাঁদার বিষয়টি স্পষ্ট উঠে এসেছে। ভাঙচুর করে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা কর্তৃপক্ষের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার ৪ দিন পর সন্ত্রসীরা শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে খানজাহান আলী রোডের এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি কারাগার থেকে বেরিয়ে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর এক সদস্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপককে হুমকি দেয়। সেখানে বলা হয়, তাদের বাহিনী প্রধানের নাম শুনেছেন কি? উত্তরে তিনি বলেন, আমি তাকে চিনি না। তাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য এক মাস পরে এ হামলা বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভয়ে তারা থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। এছাড়া নগরীতে এমন আরও অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যাদের অনেকেই মানসম্মান ও প্রাণ ভয়ে নীরবে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিচ্ছেন।
এছাড়া নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসির ব্যবস্থাপককে মোবাইল ফোন করে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। ভয়ে ফার্মেসির ব্যবস্থাপক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনার পর থেকে মালিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে।
খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: লোকমান হোসেন বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে হামলার ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। সন্ধানীর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। ওই মামলায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তিনি আরও জানায়, শনিবার খানজাহান আলী রোডে এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলার ঘটনায়ও কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। এ হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নগরীতে অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে।
খুলনার নাগরিক সমাজের নেতা আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চাঁদাবাজি, একের পর হামলা, ভাঙচুর করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরে খুলনার যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। সন্ত্রাস ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, দ্রুত জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে এই সন্ত্রাসী চক্র আরও বেপরোয়া উঠেছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদের এ ব্যাপারে আসলে কোনো রকমের কোনো তৎপরতা আমরা দেখি না। পুরোপুরি উদাসীন, প্রশাসন উদাসীন, সরকার উদাসীন। ফলে চাঁদাবাজ- সন্ত্রাসীরা তাদের কার্যক্রম বেপরোয়া গতিতে চালাতে পারছে। এদের রুখতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button