স্থানীয় সংবাদ

খুমেক হাসপাতালের রান্না ঘরে দুদকের দেড় ঘন্টা অভিযান

# সত্যতা পেয়েছে রোগীদের খাবারের চাল নি¤œমানের, মাংসের পরিমান কম #
# রান্না ঘর থেকে খাবার পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ
# খাবার চুরির সাথে জড়িত হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জসহ অনেকে
# খাবারের মান পরীক্ষার জন্য করা হতো স্পেশাল রান্না #

এইচ মনি ঃ খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে সরকারি বরাদ্দের খাবার নিয়ে রোগীদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। রোগীদের অভিযোগ দুপুরের খাবার কোনোমতে খাওয়া গেলেও রাতের খাবার একেবারেই মুখে তোলা যায় না। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী রোগী প্রতি মাংস দেওয়া কথা ৯৪ গ্রাম আর চাল মিনিকেট (চিকন) চালের ভাত। এসব পরিবর্তে রোগীদেরকে দেওয়া হচ্ছে ৪০ গ্রাম মুরগী মাংস এবং নি¤œ মানের চালের ভাত। যা নাকে নিলে গন্ধ লাগে। (দুদক) খুলনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম ও দুর্ণীতির একটি অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন খুলনা থেকে একটি অভিযান আজকে এখানে পরিচালনা করা হয়েছে। এখানে আমরা উপস্থিতি দেখতে পাই । রোগীদের দুপুরে যে খাবারটি দেওয়া হয়। সেই খাবারটি রোগীদের বিতরনের আগেই রান্না ঘরে যে খাবারটি ছিলো। সেগুলো আমরা পরিদর্শন করেছি, সরেজমিনে যাচাই করেছি। যাচাই করে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি। আজকে এখানে মোট রোগীর সংখ্যা আছে ১ হাজার ৪৯৪ জন। এর মধ্যে সিঙ্গেল ডায়েট যারা ( ডায়বেটিস রোগী) সেগুলো বাদ দিয়ে দুপুরে মোট ১ হাজার ৩৩৫ জনের খাবার তৈরি করেছেন বলে মর্মে এখানে বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা সরেজমিনে যাচাই করে দেখতে পাই কিছুক্ষণ আগে আজকে দুপুরে মেন্যু ছিল মুরগীর মাংস, ডাল এবং ভাত। আমরা সংখ্যা গননা করে দেখতে পেয়েছি এখানে মুরগীর মাংসের সংখ্যা ছিলো মোট ১ হাজার ৯৪ পিস। তার মানে হলো ৩৩০ পিস কম পেয়েছি। হাসপাতালের ডায়েট চার্ট অনুযায়ী জন প্রতি রোগীদের মাংস পাওয়া কথা প্রায় ৯৫ গ্রাম করে। আমরা রান্না করা ৫ পিস মাংস পরিমাপ করে পেয়েছি ১৩২ গ্রাম। অথাৎ গড় প্রতি পিস ২৬ দশমিক ৪ শূণ্য গ্রাম হয়। তার মানে হলে যে পরিমান মাংস পাওয়ার কথা তার ৪ ভাগের এক ভাগ রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ডায়েট চার্টে উল্লেখ আছে উন্নতমানের চিকন চাল (মিনিকেট) ভাত রোগীদের দেওয়া কথা। কিন্ত বাস্তবে এসে দেখছি সেই চালটি দেওয়া হয়নি। দেওয়া হচ্ছে খুবই মোটা চাল, রেশনের চাল এ ধরনের চাল আমরা দেখেছি। তিনি বলেন, আমরা যখন রান্না ঘরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করার সাথে সাথে এখন একজন কাজ করছেন এমন একজন ব্যক্তি সাইকেল করে কিছু মালামাল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন আমাদেরকে দেখে। আমরা তাদের হাতে নাতে ধরে যে পরিমান মালামাল পেয়েছি তার মধ্যে রয়েছে কাচা মুরগীর মাংস ৪ কেজি ৪৯ গ্রাম, ডিম (৪৯)টি, লাউ ৪টি, কলা -১৮ টি, রান্œা করা ভাত দুই পলি, চাল ২ কেজি, তেল, শুকনা ঝাল কাচা মরিচ পিয়াজ মিলে ১ প্যাকেট, পাউরুটি-৮ পাউন্ড,লবন ১ প্যাকেট, পাওয়া যায়। এসব ছিলো রোগীদের খাবার। অবৈধভাবে চুরি করে এসব বাইরে পাচারের উদ্দেশ্যে নেয়া যাওয়া হচ্ছিলো। এখানে দায়িত্বরত যে স্টুয়ার্ড হাবিব ছিলেন । তাকে আমরা পাইনি। আউটসোর্সিয়ে নিয়োজিত একজন কর্মী ছিলেন সে এগুলোর বিষয়ে কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেননি।
(দুদক) খুলনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ আরও বলেন, হাসপাতালের রোগীদের প্রতিদিন খাবারের পরীক্ষার জন্য নিয়ম আছে। সেই খানে তারা পরীক্ষার জন্য আলাদা ভাবে খাবার তৈরি করছেন। কিন্তু রোগীদের জন্য যে খাবারটা বিতরণ করা হচ্ছে সেটি একি খাবার নয়, সেটি পরিমানও এক পঞ্চামাংশ এবং মান খুবই নি¤œমানের। তিনি বলেন, খাবার পরীক্ষার জন্য একজনের বেশি খাবার থাকার কথা না, সেখানে আমরা দেখছি ২০-২৫ জনের খাবার রাখা হয়েছে। আমরা এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছি কাদেরকে এসব খাবার দিতে হয়, শুধু মাত্র পরীক্ষার জন্য আরএমও কথা বলেছেন। এছাড়া আর কারোর কথা বলতে পারেননি। এ ব্যাপারে আমরা দুর্ণীতি দমন কমিশন অফিস থেকে আইননানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া হাসপাতালের পরিচালক আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ মোঃ- নুরুল ইসলাম বলেন, দুদকের অভিযান শুদ্ধি অভিযানের একটি অংশ। আমরা অনিয়ম, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান অব্যাহত আছে। এখানেও আমরা অভিযান চালাচ্ছি তার একটি সহযোগিতামুলক একটি কার্যক্রম দুদক আসছে। আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। উনারা যে অসঙ্গতিগুলো আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন এগুলো আমরা দেখেছি। আমাদের যে নথি পত্র আছে সেগুলো আমরা মেলাবো। মেলানোর পরে যে অনিয়মগুলো আছে আমরা সেসব বিষয়ে আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
খুমেক হাসপাতালের সহকারি পরিচালক ডা: মিজানুর রহমান দুদক কর্মকর্তাদের বলেন, ২-৩ দিন হইছে হাসপাতালে সহকারি পরিচালক হিসেবে তিনি যোগদান করেছেন। তিনি দুদক কর্মকর্তাদের বলেন, যারা এসব অনিয়মের সাথে জড়িত আছে এবং প্রমান পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। রান্না ঘরে যে সাইকেলে খাবার পাচার করার প্রস্তুতি ছিলো। সেই সাইকেল জব্দ করার নিদের্শ দেন। এবং ফ্রি সার্ভিস নজরুলকে হাজির হাসপাতালে হাজির হতে বলেন।
সম্প্রতি খুমেক হাসাপাতালে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা হয়। সামসুল হক নামে এক রোগী বলেন, পাতলা ডাল দেয়। মাছ মাংসে ঝাল বা মসলার নমুনাও নেই। ভাতও দেয় মোটা চালের।” গন্ধ লাগে নাকে নিয়ে শুকলে। আরও এক রোগী বলেন, “খাবারে কোনো স্বাদ বা ঘ্রাণ নেই। মসলার দেখা নেই। দুপুরের খাবার কিছুটা খাওয়া চললেও রাতেরটা মুখে তোলা যায় না।”
হাসপাতালের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, একেকজন রোগীর জন্য খাবারের বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। সকালে ডিম, কলা ও পাউরুটি দেওয়া হয়। যেদিন রোগীদের খাবার তালিকা করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী রোগীদের খাবার তৈরি হয় না। উদাহারন হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আজকে ১ হাজার ২০০ রোগীর খাবার দেওয়া কথা আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে সেদিন দুপুর ২টার পর প্রায় ২৫০-৩০০ রোগী রিলিজ নিয়ে যায়। ওই খাবার কিন্তু রোগীরা পাচ্ছে না। কারণ সকালে ডাক্তারদের রাউন্ড দেওয়া পর বুঝা যাবে কোন কোন রোগী রিলিজ পাবেন। ফলে ওই সব রোগীর খাবার গায়েব হয়ে যায়। আবার দুপুরে পর যেসব রোগী ভর্তি হচ্ছে তারা কিন্তু রাতে ও সকালে খাবার পায় না। দুপুরে পর সব ওয়ার্ড মিলে ২০০-৩০০ রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাদের আবার রাতের খাবার দেয় না। প্রতিদিনই প্রায় ৫০০ জনের রোগীর খাবার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাইরে বিক্রি ও পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব অনিয়ম ও দুর্ণীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইনচার্জসহ অনেকেই জড়িত আছেন। স্টুয়ার্ড হাবিব দীর্ঘ বছর ধরে এসব অনিময় ও দুর্ণীতি করার একার পক্ষে সম্ভব না। এর সাথে হাসপাতালের স্ব স্ব ওয়ার্ডের ইনচার্জ ও সংশ্লিষ্ট আরএমও দের সম্পৃক্তার রয়েছেন। যা সঠিক তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে বলে ওই সূত্রটি দাবি করেছেন।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button